প্রচ্ছদ

জীবনের কথা, পর্ব-৭

  |  ১৭:৩৬, জুন ০৬, ২০২০
www.adarshabarta.com

ব্রিটিশ এমপিদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে যেভাবে

:: মোঃ রহমত আলী ::

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। সেটাতো কথার কথা নয়। বিশ্বেতরক্তকণিকা একটি নির্ভেজাল গনতান্ত্রিক দেশের আইন সভা। যাকে বলা হয়ে থাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসী’ বা ‘গণতন্ত্রের মাতৃভূমি’ এর আইন প্রনয়ন কেন্দ্র। এ পার্লামেন্ট শুধু নিজ দেশ নয় অন্য দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাপারেও প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কারণ দীর্ঘদিন থেকে যুক্তরাজ্য বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী দেশ হিসাবে পরিগনিত হয়ে আসছে। তাই এ পার্লামেন্টে যারা নির্বাচিত হন তাদের রয়েছে আলাদা একটা বৈশিষ্ঠ্য। একসময় বলা হতো এ পার্লামেন্টের ক্ষমতা এমন যে, শুধুমাত্র নারীকে পুরুষ আর পুরুষকে নারী করা ছাড়া -হেন কোন কাজ নেই যা এ পার্লামেন্ট করতে পারে না।

এটিকে ‘ওয়েস্ট মিনিস্টার পার্লামেন্ট’ বা ‘হাউজ অব কমন্স’ নামেও অবিহিত করা হয়ে থাকে।
তবে বাঙালীদের জন্য এ ক্ষেত্রে রয়েছে আরো কিছু আলাদা ব্যাপার-স্যাপার। আর সেটা হলো প্রায় দুইশত বছর ব্রিটিশরা আমাদের দেশ শাসন করেছে। তাই আমরা ছিলাম তাদের অধিনস্ত। সে হিসাবে তাদের সাথে রাজনীতিতে অংশীদার হওয়া মানে অনেকটা ‘রাজার সাথে প্রজার পাল্লা দেয়ার সামিল’। কেউ হয়তো এটা কল্পনা করেনি যে, এ র্পামেন্টে কখনো বাঙালীরা প্রতিনিধিত্ব করবে। কিন্তু সেটা এখন বাস্তব। এ পার্লামেন্টে আছেন আমাদের বাঙালী বংশোদ্ভুত চারজন এমপি। তবে শুধু এমপি হিসাবে তাঁদের কার্যক্রমকে সীমিত রাখলে চলবে না কারণ তারা সংসদে পালন করছেন আরো অনেক দায়িত্ব। হয়তো অচিরেই মন্ত্রিসভায় স্থান করে নিবেন তাঁদের কেউ কেউ।

সে যাই হউক, বাঙালী হিসাবে এ চারজন এমপির সাথে আমার অনেক স্মৃতিচারণ থাকলেও বাঙালী নন এমন এমপির সাথেও আমার সম্পর্ক ছিল। তারা হচ্ছেন, বাঙালীদের বন্ধু হিসাবে পরিচিত লর্ড পিটার শোর, সাইমন হিউজ, উনা কিং ও জর্জ গ্যালওয়ে। আমি যখন প্রথমে বৃটেনে আসি তখন পিটার শোর এমপির কাছে গিয়েছিলাম একটি বিশেষ কাজে। তিনি তখন নিজে চেয়ার থেকে উঠে এসে আমাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এতে আমি খুবই প্রীত হয়েছিলাম। যদিও পরে জানলাম যে, এটা তাদের কালচারের একটা বৈশিষ্ঠ্য। আমি যেহেতু তখন সবেমাত্র বাংলাদেশ থেকে এসেছি তাই বাংলাদেশের এমপিদের সন্ধান ও সাক্ষাৎ লাভের প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করে আমার মধ্যে এ প্রীত হওয়ার ধারণা জন্মেছিল।

লিবডেম পার্টির সাবেক এমপি সাইমন হিউজ লন্ডনের খুবই জনপ্রিয় এমপি ছিলেন। তিনি বাঙালী কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রায়ই যোগদান করতেন। এ সূযোগ তাঁর সাথে দেখা হতো। তিনি এ পর্টির লিডারশীপ নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন।

পিটার শোর এর পর উনাকিং এমপি হলে আমি অনেকবার সাক্ষাৎ করেছি তাঁর সাথে। সে মহিলা আফ্রো ক্যারাবিয়ান হলেও তাঁর ব্যবহার ও কথাবার্তা দিয়ে যে কাউকে সম্মোহিত করার ক্ষমতা ছিল অসীম। আমার একটি ব্যাপারে তিনি কয়েকবার বৃটেনের হোম অফিসে চিঠি লিখেও বিরক্ত হননি বরং বলেছেন যতবার দরকার ততবার তিনি লিখে যাবেন। তাই আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ না হয়ে পারি নাই। এরপর এমপি হয়ে আসলেন বহুল আলোচিত এমপি জর্জ গ্যালওয়ে। তাঁর বাচনভঙ্গি ছিল অত্যন্ত আকর্ষনীয়। তিনি সব সময় সাহসিকতা ও বীরদর্পে কথাবার্তা বলতেন। সাথে সাথে বাঙালীদের মন জয় করার মত দূর্বল জায়গায় স্পর্শ করে বক্তৃতা করতেন। তাই বেথনালগ্রীন ও বো এলাকার এলাকার বাঙালী ভোটারগন তাঁকে বিপুল পরিমাণ ভোট দিয়েছিলে ও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ব্রিকলেন জামে মসজিদ ও ইস্ট লন্ডন জামে মসজিদের আশেপাশে বেশী বিচরণ করতেন ও নিজের হাতে লিপলেট বিতরণ করতেন। তাই তাঁর সাথে দেখা হলেই হাস্যরস করতাম ও ফটো তুলতাম। তিনি অত্যন্ত রশিক মানুষ ছিলেন।

এর পরের ইতিহাস সবার জানা। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আসলো বাঙালী এমপি নির্বাচনের পালা। এমপি হলেন বাঙালী বংশোদ্ভ‚ত রুশনারা আলী। ২০১০ সালে তিনি পাশ করার পর থেকে তাঁর সাথে আমার বেশ কয়েকটি কারণে ঘনিষ্ঠতার সৃস্টি হয়। এর মধ্যে প্রথমটি হলো তার নামের সাথে আমার নামের মিল। অন্যটি হলো তাঁর দেশের জন্মভ‚মিও আমার জন্মভ‚মি একই উপজেলায় অবস্থিত। তা ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন সময় দর্পণ ম্যাগাজিনে তাঁর সংবাদ প্রকাশের বিষয়। তিনি ইস্ট লন্ডনের ব্রিকলেনে আমার অফিসে অনেকবারই এসেছেন ও নানা বিষয়ে মতবিনিময় করেছেন। যদিও আমার মেয়ের বিয়ের সময় ও অন্য একটি অনুষ্ঠানে তিনি কথা দিয়েও কথা রাখেন নি। দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁর সাথে আমার এ সম্পর্ক চলমান রয়েছে। এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনার হিসাবে আমি একসময় দেশে গিয়ে বিশ^নাথ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে তৎকালীন সময়ের সংশ্লিস্ট চেয়ারম্যানদের সহযোগিতায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলাম।

আপসানা বেগম সম্প্রতি এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠাতা বেশী। কারণ তিনি আমার নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা পপলার ও লাইম হাউজ এর এমপি। তা ছাড়া তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনেও আমি ব্যাপকভাবে জড়িত ছিলাম। অধিকন্তু আমি নির্বাচনের সময় দাখিলকৃত তাঁর নমিনেশন পেপারের একজন সমর্থনকারী হিসাবে স্বাক্ষর করেছি। তাঁর নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার সময়েও আমি মিডিয়ার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের ‘গেস্ট অব অনার‘ হিসাবে উপস্থিত ছিলাম। তাই তাঁর সাথে আমার আলাদা সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই বিভিন্ন সময় ফোন করে আমাদের কোশলবার্তা জানতে সচেষ্ট হন। তার পিতার সাথেও ছিল আমার খুব ঘনিষ্ঠতা। সে কারণে আপসানা আমাকে ‘চাচা‘ বলে সম্বোধন করেন।

টিউলিপ সিদ্দিক ও রুপা হকের সাথে আমার সম্পর্ক মিডিয়ার সুবাদে। তাঁদের অনেক সংবাদ আমার দর্পণ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তবে তারা এমপি হওয়ার পূর্ব থেকেই তাদের সাথে আমার জানাশুনা। বিভিন্ন প্রোগ্রাম হলে তারা আমাকে আমন্ত্রণ জানান। সময়-সযোগ হলে সেগুলিতে যোগদান করি। টিউলিপ সিদ্দিকের খালা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রূপা হকের আপন বোন কনি হক একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁরা আরো ব্যাপকভাবে পরিচিত। এজন্য অনেকেই তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে নানাভাবে সাড়া দিয়ে থাকেন।

এখানে আরো একটি বিষয় যোগ করতে হয় যে, হাউজ অব কমন্সে এ চারজন মহিলা ছাড়াও হাউজ অব লর্ডসে যিনি রয়েছেন তিনিও একজন মহিলা। নাম পলা মঞ্জিলা উদ্দিন। তাঁকে আমরা ‘পলা আপা’ বলে সম্বোধন করি। তাই আগামীতে আমাদের কমিউনিটি থেকে পুরুষ এমপি বা পুরুষ লর্ড দেখার প্রত্যাশায় সবাই। যিনি হবেন আমাদের কমিউনিটির সকলের সম্বোধনের
ক্ষেত্রে একজন ভাই। (চলবে)।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রবীণ সাংবাদিক ও দর্পণ ম্যাগাজিন সম্পাদক। ইমেইল: rahmatali2056@gmail.com