সৌদি দিগন্ত: মা, ভাই, বোনকে নিয়ে পবিত্র উমরাহ পালন
✍️ দেলওয়ার হোসেন সেলিম
জীবনে যত ভ্রমণ করেছি, সবচেয়ে মধুর, সবচেয়ে খুশির , সবচেয়ে বরকতের ভ্রমণ ছিল ২০২২ সালের সৌদি আরব সফর। এটা কোনো ট্যুর ছিল না। এটা ছিল ডাক। আল্লাহর ডাক। ফ্লাইটের রুট দুই দিক থেকে তবে এক জায়গায় মিলন। এই সফরের প্ল্যানটা ছিলো অন্যরকম। আমি ছিলাম লন্ডনে। এখান থেকে প্রথমে আমিরাত এয়ারলাইনস এ ঢাকা। সেখান থেকে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস এ সিলেট। মা, মাটি আর মানুষের কাছে। বাংলাদেশে ৭ দিন থেকে এরপর জেদ্দা এর ফ্লাইট ধরলাম ঢাকা থেকে আমিরাত এয়ারলাইনস এ ভায়া দুবাই হয়ে। অন্যদিকে আমার আম্মা, ফ্রান্স প্রবাসী ছোট ভাই সুয়েব আহমদ, ছোট বোন নাসিমা বেগম শেলী তাঁরা সিলেট থেকে বাংলাদেশ বিমান এর ডাইরেক্ট ফ্লাইটে সরাসরি জেদ্দা গিয়েছিলেন। একই দিনে।
আমি বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা পৌঁছানোর ২ ঘন্টা আগেই আম্মা, ভাই, বোনের ফ্লাইট ল্যান্ড করলো জেদ্দায়। সেখান থেকে হারামাইন বাস এ ১ ঘন্টায় মক্কা। আগে থেকেই বুকিং করা আমাদের হোটেল ছিল আজিয়াদ এরিয়ায়। মসজিদুল হারাম থেকে ১২ মিনিট পায়ে হাটার দূরত্বে।
প্ল্যান ছিলো জেদ্দা কিং আব্দুল আজিজ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এ আমরা সবাই একসাথে মিলিত হবো। আয়শা মসজিদ থেকে এহরাম বেঁধে পবিত্র উমরাহ পালনের জন্য এক সাথে রওয়ানা হবো। কিন্তু তাঁদের অলরেডি সিলেট থেকে এহরাম পরিহিত থাকায় জেদ্দা থেকে বাস যোগে মক্কায় পৌঁছে যান। আমি মক্কায় গিয়ে তাঁদের সাথে একত্রিত হই। একসাথে পবিত্র উমরাহ পালন করি।
সেদিন রাত ১০টায় জেদ্দা কিং আব্দুল আজিজ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এ যখন ল্যান্ড করলাম। গেট দিয়ে বের হতেই দেখি ৩ জন মানুষ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। আমার ফুফাতো ভাই হারিছ উদ্দিন ফারিস ভাই, আমার তালই সাহেব (ছোট ভাই সুয়েব আহমদ এর শশুড়) আলহাজ্ব আতিক রাজা মামা আর প্রিয় কামাল উদ্দিন ভাই।
তিনজনই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ” আল্লাহর মেহমান আসছেন”।
এয়ারপোর্ট থেকে তাঁদের গাড়িতে করে সরাসরি চলে গেলাম হযরত আয়শা মসজিদে। এটাই মিকাত। এখান থেকেই উমরাহর ইহরাম বাঁধতে হয়। তখন রাত ১১ টা। আয়শা মসজিদের ওজুখানায় গোসল করলাম। উমরাহ করার জন্য নির্ধারিত পোশাক পরিহিত হলাম। সাদা ২ টুকরা কাপড়। নিয়ত করলাম। রাত ১২টায় আমরা পবিত্র উমরাহ পালন করার জন্য মক্কায় রওয়ানা দিলাম। গাড়িতে বসে কায়মনোবাক্যে দোয়া করেছি আর তালবিয়া পড়েছি। “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক”। মক্কায় পৌঁছে আমার আম্মা, ভাই বোনদের সাথে একত্রিত হয়ে একসাথে পবিত্র উমরাহ পালন করার জন্য চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিলাম।
প্রথম পর্ব: মক্কা মুকাররমা ৭ দিন, আল্লাহর ঘরের মেহমান :
প্রথম তাওয়াফ মসজিদ আল-হারাম এর গেট। পা রাখতেই শরীরে কারেন্টের মতো শিহরণ। প্রথমবার কাবা দর্শন। জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই দেখলাম কাবা শরীফ। কালো গিলাফ, সোনালি কিসওয়া। রাতের উজ্জ্বল আলোয় পবিত্র কাবা ঝলমল করছে। আমরা সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। ২৪ ঘন্টা তাওয়াফ চলছে।
আমরা তাওয়াফ শুরু করলাম। কাবাকে বামে রেখে ৭ চক্কর। প্রথম ৩ চক্কর রমল। মানে কাঁধ ঝাঁকিয়ে দ্রুত হাঁটা। বাকি ৪ চক্কর স্বাভাবিক। ভিড়ের মধ্যে আম্মাকে নিয়ে হাজরে আসওয়াদ চুমু দিতে পারিনি। দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করে “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলেছি। প্রতিটা চক্করে আলাদা দোয়া। ১ম চক্কর নিজের জন্য। ২য় চক্কর মা-বাবার জন্য। ৩য় চক্কর সহধর্মিণী এবং সন্তানদের জন্য। ৪র্থ চক্কর ভাই-বোনদের জন্য। ৫ম চক্কর প্রবাসী ভাই- বোনদের জন্য। ৬ষ্ঠ চক্কর দেশ ও জাতির জন্য। ৭ম চক্কর সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করলাম। সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত ৭ বার সাঈ। সাফা পাহাড়ে উঠে কাবা এর দিকে তাকিয়ে দোয়া। তারপর হাঁটা। মারওয়াতে গিয়ে আবার দোয়া। মোট ৭ বার। হযরত হাজেরা (আঃ) এর কথা মনে পড়ল। পানির জন্য ছেলেকে রেখে দৌড়াদৌড়ি। এখানে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের কষ্টের কথা আল্লাহকে বলেছি। সাফা – মারওয়াতে ৭বার সাঈ করার পর পবিত্র উমরাহ শেষ পর্যায়ে। আমরা সেলুনে গিয়ে মাথা ন্যাড়া করলাম। মনে হলো নতুন জন্ম হলো আলহামদুলিল্লাহ। একসাথে উমরাহ পালন করলাম আমি এবং আম্মা, ছোট ভাই সুয়েব, ছোট বোন শেলী, তালই সাহেব আতিক রাজা মামা, ফুফাতো ভাই হারিছ ভাই। আল্লাহ সকলের উমরাহ কবুল করুন। আমিন। উমরাহ পালন করার পর মক্কায় হোটেলে উঠে খাবার খাই। আমার তালই সাহেব সৌদি আরবের প্রসিদ্ধ খাবার কাবসা , যা সুগন্ধি চাল, মাংস (মুরগি, খাসি বা উট) এবং বিভিন্ন মশলার সংমিশ্রণে তৈরি অত্যন্ত জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবার, আল-বাইক, আল-তাজ এর মেন্ডি, খেজুরের শরবত, লাবান, কালিজিরা, বাখর, গুয়ামুরি ভাজা অর্ডার করে নিয়ে এলেন। একসাথে বসে সবাই মজাদার বিভিন্ন আইটেমের এসব খাবার খেলাম। এরপর বিশ্রাম নিই। হোটেলটা ছিল হারামের কাছেই। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়েছি। ৭ দিনে আমরা মোট ৩ বার উমরাহ, তাওয়াফ, সাঈ করেছি। প্রতিদিনের রুটিন ছিলো: ফজর হারাম এ, সকালে বিশ্রাম, জোহর-আসর হারাম, মাগরিব-এশা তাওয়াফ, রাত ১২টার পর তাহাজ্জুদ। প্রতিদিন পান করেছি জমজমের পানি। জমজম কূপ থেকে পানি। দাঁড়িয়ে ৩ শ্বাসে পান করেছি। “আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিযকান ওয়াসিআ, ওয়া শিফাউন মিন কুলি দা’আ।“এই দোয়া পড়ে পান করেছি।
মাকামে ইব্রাহিম এর পাশে ২ রাকাত নামাজ আদায় করেছি। দিনগুলো ছিল শুধু শান্তি আর শান্তির।
সপ্তাহব্যাপী মক্কায় হোটেলে আমাদের সাথে দেখা করার জন্য বহু আত্নীয় স্বজন এসেছিলেন। এরমধ্যে একদিন আশফাক উদ্দিন চাচা সৌদি মজাদার বিভিন্ন আইটেমের খাবার নিয়ে এসেছিলেন। মাস্টার বিলাল উদ্দিন, জাহেদ ইমরান আংকেল, আব্দুল মালিক ভাই সহ আরও অনেকে।
আরেক দিন দুপুরে জেদ্দা গুলিলে জসিম উদ্দিন ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত খাওয়ার আয়োজন করলেন আমার তালই আলহাজ্ব আতিক রাজা সাহেব। মক্কার হোটেল থেকে হারিছ ভাইয়ের গড়িতে করে আমরা গেলাম।সেখানে গিয়ে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে দীর্ঘ জীবন সৌদি প্রবাসী নুর হোসেন ভাই, সংগীত শিল্পী নজির আহমদ, ড্রাইভার শাহিন আহমদ চৌধুরী, জাহেদ ইমরান, শাহেদ আহমদ, আলতাফুর রহমান, আমার চাচাতো ভাই লুকমান আহমদ, সুলেমান আহমদ, সুয়াইব আল হাসান সহ আরও অনেকের সাথে। তাঁদের আতিথেয়তা আমি কখনো ভুলব না। অচেনা শহরে এরা যেনো পরিবার হয়ে গিয়েছিলেন।
খালাতো ভাই মামুন রশিদের আতিথেয়তা :
মক্কায় হোটেলে থাকাকালীন সময়ে আমার খালাতো ভাই মামুন রশিদ ২ দিন তাঁর বাসা তাইফ শহর থেকে রান্না করে মজাদার বিভিন্ন আইটেমের খাবার এনে দিয়েছেন।
গরম গরম গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট, ভর্তা, মাছ, সব্জি, ডাল আমরা তৃপ্তি সহকারে খেয়েছি। সাথে জমজমের পানি। চায়ের ক্যাটেল।
মক্কায় জিয়ারতের স্থান সমূহ :
১ দিন ভাড়া গাড়ি নিয়ে জিয়ারত করেছি। সাথে ছিলেন আমার খালাতো ভাই সাহেব মামুন রশিদ। আরেক দিন হারিছ ভাইর গাড়িতে করে কয়েকটি স্থান জিয়ারত করেছি। এখানে মক্কার কয়েকটি জিয়ারতের স্থান উল্লেখ করছি :
জাবালে নূর ও হেরা গুহা:
৬০০ সিঁড়ি ভেঙে উপরে। এই পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি বিখ্যাত হেরা গুহা অবস্থিত। এখানেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর প্রথম পবিত্র কুরআনের আয়াত (“ইকরা… বা পড়ুন…”) নাজিল হয়েছিল।
জাবালে সাওর :
হিজরতের রাতে রাসূল সা. ও আবু বকর রা. ৩ দিন লুকিয়ে ছিলেন।
জান্নাতুল মুয়াল্লা :
হযরত খাদিজা রা., আবু তালিব সহ অসংখ্য সাহাবীর কবর। ফাতিহা পড়েছি।
মসজিদে জ্বীন :
যেখানে জ্বীনরা এসে কোরআন শুনেছিল।
মিনা, মুজদালিফা, আরাফাহ :
হজ্বের ময়দান। যদিও উমরাহ তে যাওয়া লাগে না, তবুও জিয়ারত করেছি।
জাবালে রহমত :
জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড় হলো একটি ঐতিহাসিক ছোট পাহাড়। গ্রানাইট পাথরের তৈরি এই পাহাড়টির উচ্চতা প্রায় ৭০ মিটার। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) এর মিলনস্থল।
দ্বিতীয় পর্ব: মদিনা মুনাওয়ারা – ৭ দিন – নবীর শহরে শান্তি :
উমরাহ শেষে বাস যোগে মক্কা থেকে মদিনায় প্রায় ৬ ঘন্টা সফর। রাতে বাসের সিট থেকে জানালা দিয়ে শুধু মরুভূমি আর খেজুর গাছ চোখে পড়লো। মদিনা স্টেশনে নামতেই বুকে অন্যরকম শান্তি। বাতাসে মসক আর খেজুরের গন্ধ। আমাদের হোটেল ছিলো বাবুস সালাম গেটের সামনে। মসজিদে নববী থেকে ১০ মিনিট। রাতে হোটেলে উঠে খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিই। হোটেলের জানালা দিয়ে মসজিদে নববীর সবুজ গম্বুজ দেখে মনটা শীতল হয়ে গেলো। পরদিন মসজিদে নববীতে প্রথম প্রবেশ করে জোহরের নামাজ জামাতের সহিত আদায় করলাম। নবীজীর রওজা শরীফ জিয়ারত করলাম।
আমরা নামাজের পরে লাইনে দাঁড়িয়েছি। ভেতরে ঢুকে সবুজ গম্বুজ এর নিচে। সামনে রাসূল সা.এর রওজা। “আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ। আসসালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ”। বলার সময় কান্না আটকাতে পারিনি। পাশে আবু বকর রা.ও উমর রা. এর কবর। ১০ মিনিট সময়। মনে হচ্ছিল ১০ ঘন্টা থাকি । রওজা জিয়ারত এটা ছিলো স্বপ্ন। আল্লাহর রহমতে দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণ হলো। মসজিদে নববী এর বিশাল উঠান। সাদা মার্বেল। উপরে ২৫০টা বিশাল ছাতা। আযানের সময় খুলে যায়।
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি রিয়াজুল জান্নাহ :
অনলাইনে পারমিট নিয়ে ঢুকলাম রিয়াজুল জান্নাহতে। সেখানে ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ে মহান আল্লাহর কাছে কায় মনোবাক্যে দোয়া করেছি। আলহামদুলিল্লাহ।
৭ দিনের প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে নববীতে পড়েছি। প্রতিদিন রওজা জিয়ারত করেছি।
মদিনায় বসবারত কবি আব্দুস সালাম মিয়াজি ভাইয়ের সাথে অবসর সময়ে চা, নাস্তা, খাবার খেয়েছি। একদিন রাতে রাজনীতিবীদ আলহাজ্ব জি কে গউছ ভাইয়ের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং একসাথে ডিনার খেয়েছি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে।
মদিনার জিয়ারতের স্থান সমূহ :
১ দিন বাস যোগে গাইড সহ মদিনার উল্লেখযোগ্য স্থান জিয়ারত করেছি।
মসজিদে কুবা :
ইসলামের প্রথম মসজিদ। এখানে অজু করে ২ রাকাত নামাজ পড়েছি।
উহুদ প্রান্তর :
উহুদ পাহাড়। শহীদদের কবর। হামজা রা. এর মাজার। এখানে দাঁড়িয়ে সাহাবীদের ত্যাগের কথা মনে পড়ে কেঁদেছি।
মসজিদে কিবলাতাইন :
যেখানে ২ রাকাত নামাজের সময় কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কাবা এর দিকে পরিবর্তন হয়।
সাত মসজিদ :
খন্দকের যুদ্ধের স্থান। এই স্থানটি ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খন্দকের যুদ্ধ (বা আহজাবের যুদ্ধ)-এর স্মৃতিবিজড়িত, যেখানে যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন দল ও সেনাপতিদের তাঁবু বা নজরদারি চৌকি ছিল।
বীরে ওসমান :
ওসমান রা. এর কেনা কূপ।হিজরতের পর মদিনায় মুসলিমদের জন্য সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। তখন মদিনার অন্যতম প্রধান সুপেয় পানির উৎস ছিল এই কূপটি।
মদিনার মানুষ খুবই বিনয়ী। “ইয়া হাজী” বলে সালাম দেয়।
মদিনায় লেখক বায়জিদ ফয়সল ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ :
মদিনায় একদিন মসজিদের গেটে দেখা হয়ে গেল পান্ডুলিপি প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী, লেখক, সংগঠক বায়জিদ ফয়সল ভাই এর সাথে। তিনি লন্ডনে ভ্রমণ করে দেশে ফেরার সময়ে পবিত্র উমরাহ পালন করার জন্য সৌদি আরবে যাত্রা বিরতি করেছেন। অবশ্য লন্ডনে তাঁকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। দুই লেখক, দুই দেশ থেকে এসে মসজিদে নববীর সামনে দেখা। ১ ঘন্টা বসে বই, লেখালেখি, প্রবাসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হলো। একসাথে দুপুরের খাবার খেলাম।
তৃতীয় পর্ব: জেদ্দা, কর্ণিশ ও প্রবাসী ভাইদের আতিথেয়তা :
উমরাহ এবং জিয়ারতের ফাঁকে একদিন জেদ্দায় কাটালাম।
জেদ্দা লোহিত সাগর ও বাংলাদেশী পাড়া :
মদিনার পর ২ দিন জেদ্দা। জেদ্দায় বাংলাদেশী অধ্যুষিত এরিয়া আল-বাওয়াদি ঘুরেছি। আল-বাওয়াদি এ চায়ের আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন শাহিন আহমদ চৌধুরী, সুয়াইব আল হাসান, টেইলার হেলাল আহমদ, শামীম আহমদ, ফয়সল আহমদ প্রমুখ। হেলাল ভাই আমার সফরের খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন সৌজন্য সাক্ষাৎ করার জন্য। বড় একটি রিয়াল নোট গিফট করলেন। বললেন, “দোয়া করবেন, এই রিয়াল দিয়ে পারফিউম কিনে নিবেন।” প্রিয় হেলাল ভাইয়ের সেদিনের আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম।
জেদ্দা কর্নিশ এ সুন্দর বিকেল কাটিয়েছি। এসময় উপস্থিত ছিলেন হারিছ উদ্দিন ফারিছ ভাই, আমার চাচাতো ভাই লুকমান আহমদ, সুলেমান আহমদ, গাছবাড়ি বাজারের সাবেক ব্যবসায়ী শাহেদ আহমদ, শাহিন আহমদ চৌধুরী, সুয়াইব আল হাসান প্রমুখ।
বিদায়: দুই দিকের দুই ফ্লাইট :
সফরের সবচেয়ে আবেগের দিন ছিলো বিদায়ের দিন। আমার ফ্লাইট ছিলো জেদ্দা টু দুবাই টু লন্ডন। আমিরাত এয়ারলাইনস এ।
আর আম্মা, সুয়েব , শেলীর ফ্লাইট ছিলো জেদ্দা টু সিলেট ডাইরেক্ট। বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনস এ। জেদ্দা কিং আব্দুল আজিজ এয়ারপোর্টের ডিপারচার গেটে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে বিদায় বলেছি।
জেদ্দা এয়ারপোর্ট এ আমরা সবাই একসাথে ছবি তুললাম। কান্না জড়িত কন্ঠে আম্মা বললেন, “বাবা সাবধানে যাইও লন্ডন”।
আমার ফ্লাইট পরের দিন রাতে। আমি হারিছ ভাইয়ের গাড়িতে করে এয়ারপোর্ট থেকে আল বাওয়াদিতে যাই। তালই সাহেব আতিক রাজা মামা সাথেই ছিলেন। খুবই জোর করে দাওয়াত করেছিলেন, উনার বাসায় থাকার জন্য। হারিছ ভাইও দাওয়াত করেছেন। কিন্তু প্রিয় ভাই সুয়াইব আল হাসানের সাথে কথা দেওয়ায় যেতে পারিনি। সুয়াইব আল হাসান বাওয়াদি থেকে পার্শ্ববর্তি এরিয়ায় তার বাসায় নিয়ে গেলেন। সুয়াইব খুব শ্রদ্ধা সন্মান করে আমাকে রাখলেন। দেশের গল্প, প্রবাসের গল্প হলো।রাতের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাওয়াদি পার্ক ঘুরে দেখেছি। বাওয়াদি পার্ক জেদ্দার সবচেয়ে সুন্দর ফ্যামিলি পার্কগুলোর একটা। বিশাল লেক, সবুজ ঘাস, আর বাচ্চাদের খেলার জায়গা। বাওয়াদিতে বাংগালী অধ্যুষিত এরিয়া ঘুরে দেখে দুপুরে লাঞ্চ করলাম মেজবান হাঊস এ।
নীরব ১৭ দিন ও লন্ডনে ফেরা :
সৌদি আরবে যাওয়ার ২ দিন পর।
ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিলাম। দেখি ফেইসবুক আইডি রেস্ট্রিকশন! লগ ইন করতে লেখা আসে “Account Restricted”। ইউকে থেকে এবং বাংলাদেশ থেকে আসার সময় সিম রোমিং চালু করেছিলাম, কিন্তু সৌদির নেটওয়ার্কে ঢুকতেই সব লক হয়ে গেল। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। বন্ধু মহল, আত্নীয় স্বজন — কেউ জানতো না আমি কোথায়, কেমন আছি। নতুন দেশে এসে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া ১৭ দিন কাটানো যে কতটা কঠিন, তা উপলব্ধি করতে বাকী রইলো না।
এই বিপদের সময় একজন মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো। শাহিন আহমদ চৌধুরী । শাহিন দেশে থাকাকালীন ড্রাইভার পেশায় জড়িত ছিল। সৌদিতে ১২ বছর ধরে আছে একই পেশায়। আমার বন্ধ হওয়া আইডির খবর অন্য একজনের মাধ্যমে পেয়ে নিজেই যোগাযোগ করলো। মিস্টার শাহিন বললো, “সেলিম ভাই, চিন্তা করবেন না। আমরা আছি।”একই দিন এলাকার আরও কয়েকজন প্রবাসী ভাইকে জড়ো করলেন। সবাই আমার সাথে দেখা সাক্ষাৎ করার অপেক্ষায় ছিলেন। নামগুলো আজও মনে আছে। আলতাফ ভাই, শাহেদ, সোহেল ভাই। সবাই জেদ্দায় কাজ করেন। কেউ কনস্ট্রাকশনে, কেউ দোকানে।
তাঁরা আমাকে নিয়ে গেলেন জেদ্দা কর্নিশ এ। লোহিত সাগরের পাড়। বিকেলের সোনালি রোদ পানিতে পড়ে ঝিকমিক করছিল। সমুদ্রের বাতাসে মনের সব কষ্ট ধুয়ে গেল।
জেদ্দা সাগর পাড় এ বসে আমরা চা খেলাম, গল্প করলাম দেশের কথা। হারিছ ভাই বললেন, “প্রবাসে এসে প্রথম ১ মাস সবারই এমন হয়। নেটওয়ার্ক, ভাষা, একাকীত্ব। সব মিলে কষ্ট। কিন্তু ভাই-ব্রাদার থাকলে কষ্ট কষ্ট মনে হয় না।”
সৌদিতে ৩ সপ্তাহ থাকলাম। এই সময়টায় অফলাইনেই কাটাতে হয়েছে। নামাজ, জিয়ারত, আর প্রবাসী ভাইদের সাথে আড্ডা। এটাই ছিল সফর। সৌদি থেকে দুবাই হয়ে ফ্লাইট ধরলাম লন্ডন এর উদ্দেশ্যে। লন্ডনে পৌঁছে আমাদের বাসার ওয়াই-ফাই কানেকশন দেয়ার সাথে সাথেই মিরাকল! ৩ সপ্তাহ পর, অবশেষে ফেইসবুক ওপেন হলো। অনেক ম্যাসেজ + মিসড কল।
ম্যাসেজ দেখে সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। রিপ্লাই দিতে দেরি হওয়ার জন্য দুঃখিত।
সাথে সাথেই হারিছ ভাইকে ভিডিও কল দিলাম। তিনি হেসে বললেন, “যাক, অবশেষে দুনিয়ার সাথে কানেকশন পেলেন।”
লন্ডনে বসবাসরত আমার ওয়াইফ, সন্তানদের এবং ছোট ভাই দিলদার হোসেন শামীম ও তার পরিবারের জন্য সৌদির আত্মীয় স্বজনরা খেজুর, জায়নামাজ, আতর পাঠিয়েছিলেন। সবার আথিতেয়তা ভুলবো না।
লন্ডনে ফিরে আসার দিন জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে ৫ লিটারের ১ বরমিল জমজমের পানি ক্রয় করে নিয়ে এসেছিলাম।
উমরাহ শেষে জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে এমিরেটস এর ফ্লাইটে লন্ডনে ফিরছি। জানালা দিয়ে লাল মরুভূমি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, এই সফর শুধু ভ্রমণ নয়, এটা ছিল আত্মার পরিশুদ্ধি। মা, ভাই, বোনকে নিয়ে একসাথে আল্লাহর ঘরে যাওয়ার যে সৌভাগ্য, তা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
লন্ডনের হিথ্রোতে নামার পর লন্ডনের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগলো। কিন্তু অন্তরের ভেতর তখনো কাবার উষ্ণতা, মদিনার শান্তি। মহান আল্লাহ পাক যেনো বারবার সেখানে যাওয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন। #