দিগন্ত ভ্রমণের স্মৃতি, পর্ব-০৫
প্রকাশিত হয়েছে | 13:32, September 13, 2026
www.adarshabarta.com
সুইজারল্যান্ড: বরফে ঢাকা শান্তি, লেকে ভাসা স্বপ্ন
✍️ দেলওয়ার হোসেন সেলিম
প্যারিসে থাকতে একটা কথা খুব শুনতাম – “ভাই, একবার সুইজারল্যান্ড যান। জীবন পাল্টে যাবে।” কথাটা বলতেন ফ্রান্সে থাকা পুরনো প্রবাসীরা। আমি শুনতাম আর ভাবতাম, প্যারিসই তো স্বপ্নের শহর, এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে?
২০১৭ সালের বসন্তে সেই সুযোগ এলো। হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলাম – যাবো। আমার রুট ছিল একদম সহজ, কারণ আমি প্যারিস থেকেই যাচ্ছিলাম। প্যারিস টু সুইজারল্যান্ড টু প্যারিস। যাওয়া-আসা পুরোটাই ট্রেনে। কারণ প্লেনে গেলে সুইজারল্যান্ডকে ছোঁয়া যায়, কিন্তু ট্রেনে গেলে সুইজারল্যান্ডকে জানালা দিয়ে হৃদয়ে নেওয়া যায়। অবশ্য এর আগে-পরেও একাধিকবার ইতালি-জার্মানি যাওয়ার পথে ট্রেনে বসে সুইজারল্যান্ড দেখেছি, কিন্তু এবার ছিল শুধু সুইজারল্যান্ডকে দেখার যাত্রা।
যাত্রা শুরু: প্যারিস Gare de Lyon থেকে।
সকাল ৭:২৩ মিনিট। প্যারিসের Gare de Lyon স্টেশন। প্যারিসের সবচেয়ে সুন্দর স্টেশন এটি। ঘড়ির টাওয়ার, পুরনো স্থাপত্য। প্ল্যাটফর্ম ১ থেকে TGV Lyria ছাড়বে। এটি ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ড হাই-স্পিড ট্রেন, ঘন্টায় ৩২০ কিমি বেগে চলে।
আমি টিকেট আগে থেকেই কেটেছিলাম। Swiss Travel Pass সহ ১২০ ইউরো রিটার্ন। যারা সুইজারল্যান্ড যাবেন, তাদের জন্য এই পাসটি বাধ্যতামূলক। এটি দিয়ে সুইজারল্যান্ডের সব ট্রেন, বাস, ট্রাম, এমনকি লেকের নৌকাও ফ্রি।
ট্রেন ছাড়লো। এক মিনিটও লেট না। ১০ মিনিট পরই প্যারিসের বাড়িঘর শেষ। শুরু হলো ফ্রান্সের গ্রাম। হলুদ সরিষা ক্ষেত, ছোট ছোট গির্জা, লাল টালির বাড়ি। ৩ ঘন্টা পর বেলফোর্ট এর পর বর্ডার। আমি পাসপোর্ট বের করে রেখেছিলাম, কিন্তু কেউ চেক করলো না। জানালা দিয়ে বুঝলাম আমরা সুইজারল্যান্ডে ঢুকে গেছি।
কীভাবে বুঝলাম? ঘরবাড়ি হঠাৎ পরিষ্কার, মাঠে গরুর গলায় বড় ঘন্টা, প্রতিটি বাড়ির বারান্দায় ফুলের টব, আর দূরে – দূরে আল্পসের সাদা বরফের চূড়া। ঠিক ১১:০৫ মিনিটে Zürich HB স্টেশন। আমি ঘড়ি দেখলাম – ১ মিনিটও লেট না। এটাই সুইস টাইম। এখানে ১ মিনিট লেট মানে অসম্মান।
প্রথম দিন: জুরিখ – লেকের শহর, টাকার শহর :
স্টেশন থেকে বের হয়েই জুরিখ লেক। ৪০ কিমি লম্বা লেক, পানি এত স্বচ্ছ যে তলা দেখা যায়। আমি বেঞ্চে ২ ঘন্টা বসলাম। সামনে রাজহাঁস সাঁতার কাটছে, পেছনে গ্রস মুনস্টার গির্জার দুই টাওয়ার, আর দূরে বরফের পাহাড়। সবচেয়ে অবাক হলাম – লেকের পাড়ে মানুষ বোতল ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছে। কারণ লেকের পানি সরাসরি খাওয়ার যোগ্য। প্যারিসে সিন নদীর পানি কল্পনাও করা যায় না।
তারপর গেলাম আল্টস্টাড – পুরনো শহর। পাথরের রাস্তা, ৮০০ বছরের পুরনো বাড়ি।
ফ্রাউ মুনস্টার গির্জায় ঢুকলাম। ভেতরে মার্ক শাগালের রঙিন কাঁচের জানালা। সূর্যের আলো পড়ে পুরো গির্জা রংধনু হয়ে গেছে। পাশেই সেন্ট পিটার চার্চ – ইউরোপের সবচেয়ে বড় ঘড়ির ডায়াল – ৮.৭ মিটার। এত বড় ঘড়ি যে জুরিখ লেক থেকেও সময় দেখা যায়।
বিকেলে বানহফ স্ট্রাসে গেলাম। ১.৪ কিমি দামি রাস্তা। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রাস্তাগুলোর একটি। রোলেক্স, পাটেক ফিলিপ, কার্তিয়েরের দোকান। এক কাপ কফি ৬.৫০ ফ্রাঙ্ক। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮০০ টাকা। কিন্তু কেউ দরদাম করে না। সবাই লাইনে দাঁড়ায়।
রাতে লেকের পাড়ে হেঁটেছি। ট্রেনের আওয়াজ শুনতে শুনতে ঘুম। জুরিখ আমাকে শেখালো – টাকা কীভাবে শান্ত হয়ে থাকতে পারে।
দ্বিতীয় দিন: জুরিখ থেকে জেনেভা – ট্রেনে ৩ ঘন্টার স্বপ্ন :
সকাল ৮:৩৩ মিনিটের InterCity ট্রেন। জুরিখ HB থেকে জেনেভা। এই জার্নিটা আমার জীবনের সেরা ট্রেন জার্নি।
জানালা দিয়ে – একটার পর একটা লেক। Neuchâtel লেক, Biel লেক, পাহাড়ের ভেতর সুড়ঙ্গ, আঙ্গুরের ক্ষেত, ছোট স্টেশনে ফুলের টব। ট্রেনে কোনো টিকেট চেকার চিৎকার করে না। সব ডিজিটাল। মানুষ চুপচাপ বই পড়ছে, ল্যাপটপে কাজ করছে। কেউ জোরে কথা বলে না।
১১:১৮ মিনিটে Geneva Cornavin স্টেশন।
প্রথমেই গেলাম লেক জেনেভা ও জে দ্যু ফোয়ারা দেখতে। ১৪০ মিটার উঁচু ফোয়ারা। সেকেন্ডে ৫০০ লিটার পানি ২০০ কিমি বেগে উপরে উঠছে। রোদে রংধনু তৈরি হয়েছে। আমি ১ ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাতাসে পানির কণা এসে মুখে লাগছে।
তারপর প্যালাই দে নেশনস – জাতিসংঘের ইউরোপীয় সদর দপ্তর। গেটের সামনে Broken Chair – ১২ মিটার উঁচু ভাঙা চেয়ার। একটি পা ভাঙা। ল্যান্ডমাইনে পা হারানো মানুষের প্রতীক। দেখে বুক কেঁপে উঠলো। ভেতরে ট্যুর নিলাম ১৫ ফ্রাঙ্ক দিয়ে। গাইড বললেন – “এখানে প্রতিদিন পৃথিবী বাঁচানোর প্ল্যান হয়।”

Jardin Anglais পার্কে ফুলের ঘড়ি দেখলাম। ৬,৫০০ ফুল দিয়ে ৫ মিটার বড় ঘড়ি। সেকেন্ডের কাঁটা এখনো চলছে। ফুল দিয়ে ঘড়ি – একমাত্র সুইসদের মাথায়ই আসতে পারে।
রাতে ডায়েরিতে লিখলাম – “জুরিখ টাকা কামায়, জেনেভা পৃথিবী বাঁচায়।”
তৃতীয় দিন: জেনেভা থেকে লুসার্ন – সবচেয়ে সুন্দর রুট :
সকাল ৯টার ট্রেন। জেনেভা থেকে Bern হয়ে লুসার্ন। ৩ ঘন্টার রাস্তা। Bern এর পর থেকে আল্পস শুরু। ট্রেন পাহাড়ের উপর দিয়ে, লেকের পাশ দিয়ে, কখনো মেঘের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই রুটে মোবাইলে ছবি তুলে শেষ করা যায় না।
দুপুর ১২টায় Luzern স্টেশন। নেমেই মনে হলো পোস্টকার্ডের ভেতর ঢুকে গেছি।
লুসার্ন লেক – চারপাশে Pilatus আর Rigi পাহাড়। নীল পানি, পাহাড়ের ছায়া পানিতে। ৩৫ ফ্রাঙ্ক দিয়ে ১ ঘন্টা নৌকায় ঘুরলাম। নৌকার ডেকে বসে মনে হলো – আল্লাহ বোধহয় অবসর সময়ে এই শহরটা বানিয়েছেন।
কাপেল ব্রুক – ১৩৩৩ সালের কাঠের ব্রিজ। ২০৪ মিটার লম্বা। ইউরোপের সবচেয়ে পুরনো কাঠের ব্রিজ। ভেতরের ছাদের কাঠে ১২০টা পুরনো পেইন্টিং আঁকা। মাঝখানে পাথরের টাওয়ার – আগে জেলখানা ছিলো। এখনো কাঠের গন্ধ লেগে আছে।
লায়ন মনুমেন্ট – পাহাড় কেটে ১০ মিটার লম্বা মৃত সিংহ। ১৭৯২ সালে ফ্রান্সের রাজা লুইকে বাঁচাতে ৭৮৬ জন সুইস গার্ড জীবন দিয়েছিল – তাদের স্মৃতি। সিংহটির চোখে তীর, তবুও সে রাজার প্রতীক ঢাল আঁকড়ে ধরে আছে। দেখে চোখে পানি এসেছিলো।
মুসেগ ওয়াল – ১৩৮৬ সালের শহরের দেয়াল। ৯টা টাওয়ার। উপরে উঠলে পুরো লুসার্ন, লাল ছাদের বাড়ি, লেক আর আল্পস একসাথে দেখা যায়। টিকেট লাগে না। কেউ পাহারা দেয় না।
সুইজারল্যান্ডের মানুষ ও জীবন যাপন: ৩ দিনে যা শিখলাম
১. শৃঙ্খলা: ট্রেন ১ মিনিটও লেট না। রাস্তায় এক টুকরো ময়লা নেই। মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। লাল বাতি কেউ ক্রস করে না, রাত ২টায়ও না।
২. প্রকৃতি প্রেম: প্রতিটা বাড়ির বারান্দায় ফুল। লেকের পানি খাওয়ার যোগ্য। বাতাসে ধোঁয়া নেই। তারা প্রকৃতিকে ভয় পায় না, ভালোবাসে।
৩. ভাষা: ৪টা জাতীয় ভাষা – জার্মান (৬৩%), ফ্রেঞ্চ (২৩%), ইতালিয়ান (৮%), রোমান্স (১%)। কিন্তু সবাই ইংরেজি জানে। কেউ ভাষা নিয়ে ঝগড়া করে না।
৪. দাম: পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ। হোটেল ১২০-১৫০ ফ্রাঙ্ক, এক বেলা খাবার ২০-৩০ ফ্রাঙ্ক, এক বোতল পানি ৪ ফ্রাঙ্ক। কিন্তু নিরাপত্তা ১০০%। রাত ২টায় মেয়েরা একা হাঁটে, কেউ তাকায়ও না।
৫. সময়: সবাই ঘড়ি দেখে চলে। সময় মানে সম্মান।
ফেরা: লুসার্ন থেকে প্যারিস – আবার ট্রেনে।
সন্ধ্যা ৬টার ট্রেন। রুট: লুসার্ন → Basel → প্যারিস Gare de Lyon। লুসার্ন থেকে Basel ১ ঘন্টা। Basel SBB স্টেশনে ২০ মিনিট বিরতি। কফি খেলাম। Basel থেকে আবার TGV Lyria। ৩ ঘন্টায় প্যারিস।
রাত ১১টায় প্যারিস পৌঁছালাম। পুরো রাস্তা ট্রেনের জানালা দিয়ে আল্পসের শেষ আলো দেখতে দেখতে ফিরলাম। ট্রেনে বসে ডায়েরিতে লিখেছিলাম:
“পৃথিবী সুন্দর হতে পারে – তার সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ সুইজারল্যান্ড।
এখানে মানুষ সুন্দর, প্রকৃতি সুন্দর, শৃঙ্খলাটাও সুন্দর। প্যারিস ছিল স্বপ্নের মতো, সুইজারল্যান্ড হলো সেই স্বপ্নের বিশ্রাম।” #

