প্রচ্ছদ

দিগন্ত ভ্রমণের স্মৃতি, পর্ব – ০৬

  |  13:41, September 20, 2026
www.adarshabarta.com
এথেন্স: মার্বেল, মিথ ও সাগরপাড়ের মানুষ
✍️ দেলওয়ার হোসেন সেলিম 
ইউরোপ মানেই ইতিহাস। আর ইউরোপের ইতিহাস মানেই গ্রীস। দর্শনের জন্মভূমি, গণতন্ত্রের সূতিকাগার, আর সভ্যতার আঁতুড়ঘর। ইতিহাস যদি হেঁটে দেখা যেত, তাহলে মানুষ আগে এথেন্স যেত। এটা শুধু গ্রীসের রাজধানী না। এটা পশ্চিমা সভ্যতার প্রথম পাঠশালা। এখানে গণতন্ত্রের জন্ম, দর্শনের জন্ম, আর অলিম্পিকের জন্ম। ২০১৮ সালে প্যারিস থেকে আমি ১ সপ্তাহের ভ্রমণে গিয়েছিলাম এই ৩৪০০ বছরের পুরনো শহরে। সাথে ছিল বরফ, বিঘ্ন, আর মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প।
তুষারপাতের প্যারিস ও শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্ট যাওয়ার দিনটা ছিল অন্যরকম। তখন প্যারিসে খুব বেশি তুষারপাত হয়েছিল। সারা শহর সাদা চাদরে ঢাকা।
আমার মনে আছে এথেন্স যাওয়ার দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমার বাসার বিল্ডিং এর মেইন দরজা জোরে ধাক্কা দিয়ে খুলতে হয়েছিল। বরফ জমে দরজা আটকে গিয়েছিল। বিপর্যয় বিঘ্ন ঘটেছিল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। মেট্রো দেরি, বাস বন্ধ। ট্যাক্সিও পাওয়া যাচ্ছিল না। এর মাঝেই বের হলাম। প্যারিসের অদূরবর্তী ভার্সাইতে আমার বাসা থেকে শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্ট। ফ্লাইট এজিয়ান এয়ারলাইনস। কিন্তু সরাসরি না। সার্বিয়ার বেলগ্রেড ট্রানজিট হয়ে এথেন্স।
বেলগ্রেড এয়ারপোর্টে ৩ ঘন্টা বসার পর আবার উড়াল। জানালা দিয়ে সার্বিয়া দেখেছি। নিচে নীল সাগর, উপরে রোদ। ৩ ঘন্টা পর ল্যান্ড করলাম এথেন্স ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। প্যারিসের হিম থেকে সরাসরি ১৫ ডিগ্রি রোদ।

প্রথম দিন ও ভাষার ধাক্কা :
এথেন্স এয়ারপোর্ট থেকে মেট্রো লাইন ৩ ধরে শহরে ঢুকলাম। টিকেট মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে ৫ মিনিট। সব লেখা গ্রীক ভাষায়।
এথেন্স শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে গ্রীক ভাষায় লিখা দেখে আমি পড়তে না পারায় অসুবিধা হয়েছে। ΣΤΑΘΜΟΣ মানে Station, ΕΙΣΟΔΟΣ মানে Entrance। একটা অক্ষরও চিনি না। পাশের এক ভদ্রলোক বললেন, Use English button। চাপ দিয়ে দেখি আছে। অবশ্য কয়েক যায়গায় গ্রিক ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি লিখা আছে। কিন্তু বাস, ট্রামের ভেতরের ঘোষণা সব গ্রীক।
এথেন্স: সভ্যতার শহর ও আমার প্রথম রাতের ছবি :
এয়ারপোর্ট থেকে মেট্রো করে সিনতাগমা স্কয়ার এর কাছে হোটেল। ব্যাগ রেখেই বের হলাম। আমার ছবিটা এখানকারই। এথেন্সে আমার সফরসঙ্গী ছিলো সহোদর ছোট ভাই সাইফুর রহমান শিপু এবং মামুন রশিদ ভাই।
রাত ৮টা। পেছনে আলোকিত হেলেনিক পার্লামেন্ট বিল্ডিং। আগে এটা ছিল রাজপ্রাসাদ। ১৮৪৩ সালে বানানো। নিওক্লাসিক্যাল স্থাপত্য। সামনে মার্বেলের বিশাল চত্বর। সামনে ইভজোনস সৈনিক পাহারায়। লাল টুপি, সাদা কিল্ট, কালো জুতা। প্রতি ঘন্টায় গার্ড চেঞ্জ হয়। পর্যটকরা ভিড় করে দেখে। আমি আধা ঘন্টা দাঁড়িয়ে দেখেছি। দাঁড়িয়ে মনে হলো ২৫০ বছর আগের মানুষও এই পাথরে হেঁটেছে।
দ্বিতীয় দিন: অ্যাক্রোপলিস ও পারথেনন :

এথেন্স মানেই অ্যাক্রোপলিস। ১৫০ মিটার উঁচু পাহাড়ের উপর শহর। উপরে পারথেনন। দেবী এথেনার মন্দির। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩৮ সালে বানানো। মার্বেলের থামগুলো ২৫০০ বছর পরও দাঁড়িয়ে আছে। টিকেট ২০ ইউরো। উপরে উঠে পুরো এথেন্স শহর পায়ের নিচে। নীল আকাশ, সাদা বাড়ি।
এরেকথিয়ন :
এখানে ৬ জন নারী মূর্তি ছাদ ধরে আছে।  ক্যারিয়াটিডস। আসলগুলো মিউজিয়ামে, এখানে নকল। প্রোপিলিয়া ও টেম্পল অফ এথেনা নাইকি গেট আর বিজয়ের দেবীর ছোট মন্দির। উপর থেকে নিচে তাকালে পুরো এথেন্স। সাদা বাড়ি, নীল জানালা। দূরে এজিয়ান সাগর এর একটা ঝলক।
বিকেলে অ্যাক্রোপলিস মিউজিয়াম। কাঁচের বিল্ডিং। মেঝে কাঁচের, নিচে খনন করা রোমান বাড়ি দেখা যায়। পারথেননের ফ্রিজ, মেটোপ সব এখানে। ৩ ঘন্টা লেগেছে।
তৃতীয় দিন: আগোরা ও গণতন্ত্রের মাটি :
প্রাচীন আগোরা ছিল প্রাচীন এথেন্সের হৃদয়। এখানে বাজার বসত, আদালত বসত, আর সক্রেটিস এখানে মানুষকে প্রশ্ন করতেন।
স্টোয়া অফ আত্তালোস এখন মিউজিয়াম। ২৫০০ বছরের মাটির পাত্র, মুদ্রা, অস্ত্র।
পাশেই টেম্পল অফ হেফাইস্তোস। আগুনের দেবতার মন্দির। সবচেয়ে ভালো সংরক্ষিত গ্রীক মন্দির। রোমান আগোরা ও টাওয়ার অফ দ্য উইন্ডস। ৮ দিকের বাতাসের দেবতার নাম লেখা। পৃথিবীর প্রথম ওয়েদার স্টেশন। দেখতে চমৎকার।
সন্ধ্যায় প্লাকা। অ্যাক্রোপলিসের পাদদেশের পুরনো পাড়া। সরু গলি, বোগেনভিলা ফুল, তাভের্না। সুভলাকি ৩.৫ ইউরো। গ্রীক সালাদ খেলাম।
চতুর্থ দিন: জিউস স্টেডিয়াম ও বাংলাদেশীদের গল্প :
সকালে টেম্পল অফ অলিম্পিয়ান জিউস। ১০৪টি থামের মধ্যে ১৫টা আছে। প্রতিটি ১৭ মিটার উঁচু। পাশেই হ্যাড্রিয়ানের খিলান।
তারপর পানাথেনাইক স্টেডিয়াম। পুরোটা সাদা মার্বেলের। ১৮৯৬ সালের প্রথম আধুনিক অলিম্পিক এখানে হয়। ৫০ হাজার আসন। ট্র্যাকে দৌড়ে দেখলাম।
সন্ধ্যায় মনাস্তিরাকি ফ্লি মার্কেট। এখানেই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এথেন্সের বাংলাদেশী ভাইদের সাথে দেখা। এথেন্সে বহু সংখ্যক বাংলাদেশী আছেন। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কনস্ট্রাকশন, সিজন্যাল ফ্রুটস সংগ্রহ, ডেলিভারিতে কাজ করেন।
কয়েক জনের সাথে আলাপ করেছি তাদের প্রবাস জীবন নিয়ে। চা দোকানে বসে ২ ঘন্টা গল্প। আমার শরীরে শিহরণ হয়েছে, তাদের গ্রীসে পৌঁছার গল্প শুনে।
এক ভাই বললেন, “ভাই, ১২ লাখ টাকা দিয়েছি দালালকে। লিবিয়া থেকে নৌকায় ৩ দিন সাগর। পানি, খাবার ছিল না। ৪০ জনের মধ্যে ২ জনের করুণ পরিণতি হয়েছে”।
আরেকজন বললেন, “তুরস্কের জঙ্গল দিয়ে ৫ রাত হেঁটেছি। পুলিশের তাড়া খেয়েছি। গ্রীসে এসে ২ বছর কাগজ ছাড়া ছিলাম”।
জীবন বাজী রেখে অনেকেই সাগর, জঙ্গল পথ পাড়ি দিয়ে দালালের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ খরচ করে গ্রীসে এসে অনিশ্চিত জীবন যাপন করছেন! তারা রেস্টুরেন্টে ১০ ঘন্টা কাজ করে। বেতন ৭০০-৮০ ইউরো। অর্ধেক দেশে পাঠায়।
গ্রীসের এই বিপদজনক পরিস্থিতি নিরসনে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা প্রয়োজন। বৈধ পথ, দালাল চক্র বন্ধ, আর মানবিক আচরণ দরকার। তারা রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
পঞ্চম দিন: মিউজিয়াম ও লাইকাবেটাস :
সকাল বেলায় ন্যাশনাল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়াম। ২ ঘন্টা। মাস্ক অফ আগামেমনন সোনার। আন্টিকাইথেরা মেকানিজম পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার।
বিকেলে মাউন্ট লাইকাবেত্তুস। এথেন্সের সর্বোচ্চ পাহাড়, ২৭৭ মিটার। ফিউনিকুলারে উঠলাম। উপরে ছোট চার্চ। সূর্যাস্ত। নিচে পুরো শহর, দূরে পিরিয়াস বন্দর, আর নীল সাগর।
ষষ্ঠ দিন: কেপ সুনিয়ন
দিনের ট্যুর। বাসে ১.৫ ঘন্টা। গন্তব্য টেম্পল অফ পসেইডন। সমুদ্রের কিনারে ৬০ মিটার উঁচু পাহাড়ের উপর। ৪৪০ খ্রিস্টপূর্বে বানানো। নিচে ঢেউ ভাঙছে। লর্ড বায়রন এখানে নাম খোদাই করে গেছেন। সূর্যাস্ত দেখে ফিরলাম। বাসে সবাই চুপ। প্রকৃতি কথা বলছিল।
সপ্তম দিন: বাজার, ভাষা ও মানুষ :
সারাদিন হেঁটেছি। কেন্দ্রীয় বাজার এ মাছ, মাংস, পনির। ভারভাকিওস মার্কেট।
এথেন্সের মানুষ খুব হেল্পফুল। দোকানদার ইংরেজি না জানলেও হাত দিয়ে বুঝায়। এক বৃদ্ধ বললেন, “Welcome, Philoxenia”। মানে আতিথেয়তা।
এথেন্সের আরো কিছু জায়গা :
আনাফিওতিকা: প্লাকার ভেতর সাইক্ল্যাডিস গ্রামের মতো। সাদা-নীল বাড়ি।
ন্যাশনাল গার্ডেন : পার্লামেন্টের পেছনে। কচ্ছপ, হাঁস।
কেরামেইকোস সেমেট্রি : প্রাচীন কবরস্থান।
স্তাভ্রোস নিয়ারকোস: আধুনিক লাইব্রেরি ও অপেরা। সমুদ্রের পাশে।
পানাথেনাইক স্টেডিয়াম : পুরোটা সাদা মার্বেলের। এখানেই প্রথম আধুনিক অলিম্পিক ১৮৯৬ সালে হয়েছিল।
এথেন্সের স্বাদ :
সুভলাকি ও জাইরো: পিটা রুটির মধ্যে মাংস, টমেটো, পেঁয়াজ। ৩ ইউরো।
মুসাকা: বেগুন, আলু আর কিমা দিয়ে বেক করা।
গ্রীক কফি: ঘন, তলায় গাদ।
বাকলাভা: মধু আর পেস্তা দিয়ে মিষ্টি।

এথেন্স আমাকে ৩টা শিক্ষা দিয়েছে।
১. ইতিহাস: মানুষ কিভাবে ২৫০০ বছর আগে গণতন্ত্রের কথা ভেবেছে।
২. সৌন্দর্য: সাদা মার্বেল আর নীল সাগরের মিশ্রণ।
৩. বাস্তবতা: স্বপ্নের ইউরোপে আসতে গিয়ে কত মানুষ জীবন দিচ্ছে!
এথেন্স থেকে মিলান :
এথেন্স থেকে সপ্তাহ পরে ইতালীর মিলান এয়ারপোর্টে যাই এজিয়ান এয়ারলাইনস যোগে। ২ ঘন্টার ফ্লাইট। নিচে আল্পস পর্বত দেখা যাচ্ছিল। একদিন মিলানে অবস্থান করে ছিলাম। পরের দিন মিলান মালপেনসা এয়ারপোর্ট  থেকে প্যারিস শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্ট এ ফিরে এসেছিলাম। ২ ঘন্টার ফ্লাইট। প্যারিসে নেমে আবার সেই বরফ।
বরফের প্যারিস থেকে রোদের এথেন্স, এথেন্স থেকে ফ্যাশনের মিলান। এই ৮ দিনে বুঝেছি ইউরোপ একটা বই। আর প্রতিটি শহর একেকটা অধ্যায়। #