প্রচ্ছদ

দিগন্ত ভ্রমণের স্মৃতি, পর্ব – ০৭

  |  09:06, September 27, 2026
www.adarshabarta.com
মরুর মুক্তা দুবাই: বুর্জ, বাজার ও বাংলাদেশী আতিথেয়তা
✍️ দেলওয়ার হোসেন সেলিম 
মরুভূমি থেকে উঠে আসা স্বপ্নের শহর দুবাই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই শহর মাত্র ৫০ বছরে কৃষকদের গ্রাম থেকে পরিণত হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি শহরগুলোর একটিতে। এখানে আকাশ ছোঁয়া বিল্ডিং, কৃত্রিম দ্বীপ, আর সোনার বাজার। আর সবচেয়ে বড় কথা — এখানে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী। ১ সপ্তাহের ভ্রমণে গিয়েছিলাম এই মরুর মুক্তায়। পবিত্র মাহে রমজানের ভোরে প্যারিস থেকে উড্ডয়ন। ২০১৯ সাল। প্যারিসে সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়েই রওয়ানা দিলাম Charles de Gaulle Airport এর উদ্দেশ্যে।
বাইরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। আমার সহোদর ছোট ভাই সাইফুর রহমান শিপু এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিল। গেটে দাঁড়িয়ে বললো, “ভাইয়া, দুবাইতে গিয়ে সাবধানে থাকবেন। সেখানে গরম আবহাওয়া”।
প্যারিসের ঠান্ডা ছেড়ে Emirates Airlines এর ফ্লাইটে উঠলাম। সকালের ফ্লাইট। জানালা দিয়ে নিচে ইউরোপের শহর, তারপর ভূমধ্যসাগর, তারপর মরুভূমি।
প্রায় ৭ ঘন্টা পর যখন ফ্লাইট ল্যান্ড করলো,  তখন UAE তে সন্ধ্যা। প্যারিসের ১০ ডিগ্রি ঠান্ডা ছেড়ে এসে নামলাম দুবাইয়ের ৪০ ডিগ্রি গরমে। গায়ে সাথে ঘাম। এটাই দুবাই।
দুবাই এয়ারপোর্টে ফুলেল শুভেচ্ছা :
ফ্লাইট থেকে নেমে টার্মিনালের গেটে যা দেখলাম, তা কল্পনাও করিনি। ১৫-২০ জন মানুষ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
হাতে ফুলের তোড়া। মুখে একটাই কথা  Welcome to Dubai. এরা সবাই দুবাইতে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মিস্টার হারুন রশিদ ভাই সাহেব। আমার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন রেমিট্যান্স যোদ্ধা বাবুল রানা চৌধুরী ভাই আর আবুল হাসনাত ভাই। তিনজনই আমার গাছবাড়ি এলাকার মানুষ। নিজের এলাকার মানুষকে বিদেশের মাটিতে দেখা — এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
সেদিন এয়ারপোর্টে যাঁরা আমাকে উষ্ণ অভিবাদন জানিয়েছিলেন তাঁদের নাম না নিলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে :
দুবাই ও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাবসায়ী হারুন রশিদ, মাওলানা হারুন রশিদ সাহেব, শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিত, আমার ছোট চাচাজি নজমুল ইসলাম বাবুল, তরুণ সমাজ সেবক বাবুল রানা চৌধুরী, তরুণ ব্যবসায়ী আবুল হাসনাত, কানাইঘাট প্রবাসী সমাজ কল্যাণ পরিষদ দুবাইর সভাপতি জুনায়েদ আহমদ, সহ সেক্রেটারী হোসাইন আহমদ, কন্ঠ শিল্পী সোলায়মান আল মাহমুদ, আমার মামাতো ভাই ফয়সল চৌধুরী, কবির উদ্দিন, ড্রাইভার জসিম উদ্দিন, টেইলার কয়সর মাসুম, সুমন আহমদ, দিলশাদ প্রমুখ।
হারুন ভাইয়ের গাড়ি আর বাবার স্মৃতি :
এয়ারপোর্ট থেকে হারুন ভাই সাহেবের বিলাস বহুল গাড়িতে উঠলাম। বাঙালি অধ্যুষিত Al Karama, Al Satwa এলাকার দিকে যাচ্ছি। গাড়িতে বসে রামবুটান ফল খাচ্ছি। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি আকাশচুম্বী বিল্ডিংয়ের দিকে। মাথা তুলে তাকাতে হয়। হঠাৎ হারুন ভাই গাড়ি স্লো করে হাত উঁচিয়ে বললেন, “সেলিম, ওই যে দেখো”। একটা পুরাতন এলাকা দেখিয়ে বললেন, এখানেই তোমার আব্বা ডা. সিরাজুল ইসলাম সাহেব দীর্ঘদিন সুনামের সাথে ব্যবসা করেছেন। দুবাইয়ের পুরাতন ব্যবসায়ীরা এখনো তোমার আব্বার নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো। আধুনিক দুবাই গড়তে গিয়ে পুরাতন অনেক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিন্তু বাবার সুনাম? সেটা আজও মানুষের হৃদয়ে অটুট আছে।
প্রবাসে আপনজনের ভালোবাসা :
দুবাইতে পা রাখার পর যা পেলাম তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। হারুন ভাই সাহেবের অফিসে গিয়ে বসলাম। আবুকাডো জুস, চা পান করলাম। আমার খবর শোনে আশেপাশে থাকা প্রিয় জনেরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করার জন্য ছুটে এলেন। আমাদের এলাকার সর্বস্তরের প্রবাসী ভাইয়েরা, চাচারা আমাকে বুকে টেনে নিলেন। কেউ বললেন, “তুমি সিরাজ ডাক্তারের ছেলে না?”কেউ বললেন, “আরে সাংবাদিক সাহেব যে!” কেঊ বললেন, “ইউরোপ প্রবাসী,” আবার কেউ আবেগে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ফ্রেন্ডশিপ এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটার!” আমি এক নগন্য মানুষ। কিন্তু সেদিন মনে হলো — আমি যেন গর্বের ধন, কৃতি সন্তান। জীবনে এরচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া আর কি আছে?
ফ্রেন্ডশিপ এন্টারপ্রাইজের প্রসংগ :
এবার ফিরে যাই ১৯৯৮ সালে।
জন্মভূমি কানাইঘাটের গাছবাড়ি এলাকার সীমা বাজারে আমি চালু করেছিলাম “ফ্রেন্ডশিপ এন্টারপ্রাইজ”। তখনকার দিনে যোগাযোগ ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। সিলেট মহানগরের সাথে সড়ক যোগাযোগও ভালো ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না। প্রবাসী পরিবারের মানুষজন আত্মীয়দের সাথে কথা বলতে সিলেট মহানগরীর লালবাজার, মহাজনপট্টি, তালতলার আবাসিক হোটেলে গিয়ে রাত কাটাতেন। সময়, অর্থ আর কষ্ট — সবই যেত। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। নতুন চালু হওয়া অত্যাধুনিক বিআরটিএ’র ডিজিটাল টেলিফোন সার্ভিস নিয়ে আসবো নিজ এলাকায়। জেনারেটর আর বড় ব্যাটারির মাধ্যমে চালু করলাম সিস্টেম। ইয়াহিয়া ভাই সাহেবের দোতলা বিল্ডিংয়ের ছাদের অনেক উপরে ফিটিং করলাম এন্টেনা। গোটা এলাকার মানুষের একমাত্র টেলিফোন যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠলো “ফ্রেন্ডশিপ এন্টারপ্রাইজ”। আমার পরিচালিত পাবলিক কল অফিসে স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষিত যুবককে কাজ দিলাম। তাঁরা স্বাবলম্বী হলো। তাঁদের সংসারে হাসি ফিরলো।
গাছবাড়ি বাজারে আমার আব্বার পরিচালিত দ্যা হোসেন ফার্মেসীর পাশেই আমাদের নিজস্ব বিল্ডিংয়ে ফ্রেন্ডশিপ এন্টারপ্রাইজে খুললাম কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার। পাবলিক টেলিফোন অফিসের পাশাপাশি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনায় ছিলেন আমার ছোট ভাই দিলদার হোসেন শামীম এবং সাইফুর রহমান শিপু। আমাদের এখান থেকে কম্পিউটার  ট্রেনিং নিয়ে অনেক যুবক বিদেশে গিয়ে ভালো চাকরি পেয়েছে। আজও তারা ফোন করে দোয়া করে। আমি এই অফিসে বসে কানাইঘাট উপজেলার মানুষের সুখ দুঃখ, হাসি কান্না, প্রত্যাশা প্রাপ্তির কথা পত্রিকায় প্রেরণ করতাম।
দুবাইতে কৃতজ্ঞতার বৃষ্টি :
বছর ঘুরে যখন দুবাইতে গেলাম, তখনই বুঝলাম সেই কষ্টের দাম। একজন বয়স্ক চাচা হাত ধরে বললেন, “বাবা, তোমার ওই টেলিফোনের জন্যই ১৯৯৯ সালে আমার মায়ের সাথে শেষবার কথা বলতে পেরেছিলাম। আল্লাহ তোমার ভালো করুক। “আরেকজন যুবক বললেন, “ভাই, আপনার কম্পিউটার কোর্স করেই আমি দুবাইতে আইটির চাকরি পাইছি।” সেদিন বুঝলাম — ব্যবসা মানে শুধু লাভ না। ব্যবসা মানে মানুষের উপকার।
দুবাই শেখালো দুটি জিনিস। এক: পিতার সুনাম সন্তানের সবচেয়ে বড় পুঁজি। দুই: মানুষের জন্য কিছু করলে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান, সম্মান আপনার পিছু ছুটবে।বাবা নেই। কিন্তু তাঁর নাম আছে।
ফ্রেন্ডশিপ এন্টারপ্রাইজ নেই। কিন্তু তার উপকারের কথা আছে। এটাই আমার দুবাই দিগন্ত। দুবাইতে পৌঁছার পরের দিন ব্যবসায়ী মামুন ভাই আমাকে সাথে নিয়ে দোকানে গিয়ে UAE এর Etisalat (ইতিসালাত) সিমকার্ড ইন্টারনেট যুক্ত করে গিফট দিলেন। কাওসার মাসুম মোবাইলের জন্য পাওয়ার ব্যাংক গিফট করলো।
ইন্টারন্যাশনাল সিটি ও মেহমানদারী  :
আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল দুবাই ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে। চায়না ক্লাস্টার এর কাছে। ফ্ল্যাটটিতে আমার ছোট চাচাজি থাকতেন। নিচেই বাংলাদেশী দোকান। “ঢাকা স্টোর”, “চিটাগং গ্রোসারি”। প্রথম ২ দিন থাকার পর অদুরেই বাবুল রানা চৌধুরী ভাইদের বাসায় অবশিষ্ট দিন থাকলাম। ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে দেখা হলো আমার সহপাঠী আশফাক আহমদ, তরুণ ব্যবসায়ী নুরে আলম সিদ্দিকী জুয়েল ভাই, গাছবাড়ি বাজারের সাবেক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল ভাই, ফারুক আহমদ ভাই, আলাউর রহমান, ইকবাল ভাই, গাছবাড়ি বাজারের সাবেক তরুণ ব্যবসায়ী জাহেদ, সীমা বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুন নুর, আমাদের গ্রামের সয়ফুল আলম, বুরহান চাচা, শিব্বির আহমদ, টেইলার জুনেদ, জিয়া উদ্দিন ভাই, পাবেল প্রমুখের সাথে। আব্দুল জলিল ভাইকে নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে ঘাসের উপরে বসে দীর্ঘ সময় গল্প হলো। স্মৃতি রোমন্থন হলো। দুবাইতে গিয়ে যাঁদের সাথে দেখা হলো তাঁদের সাথে দীর্ঘ কয়েক বছর পর দেখা সাক্ষাৎ হওয়ায় ভালো লাগলো।
আবির মার্কেট  ও কমিউনিটির স্মৃতি :
দুবাইয়ের আল আবির বাজার (Al Aweer Market) মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফল ও সবজির বাজার। আমার সহপাঠী আব্দুল মালিক  — স্কুলের বন্ধু। তিনি এখন আবির মার্কেটের বড় ব্যবসায়ী। আমাকে দেখে বললেন, তোমার সাথে অবশেষে দেড় যুগ পরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। দোকানে তাঁর চেয়ারে বসতে বললেন। আমাকে একটি লম্বা দিরহাম নোট গিফট করলেন। এভাবেই ভেজিটেবল এন্ড ফ্রুটস মার্কেটে অনেক প্রিয়জনেরা আমাকে হাসিমুখে গিফট করলেন। এই রেওয়াজ অন্যান্য দেশে ভ্রমণে গিয়ে কম দেখেছি। শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা জানাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসীদেরকে। আমার ছোট চাচাজি নজমুল ইসলাম বাবুল, কবির সেঠ মামা , আবু তাহির ভাই সাহেব, আমার চাচাতো ভাই কামাল উদ্দিন, জসিম উদ্দিন, সেলিম উদ্দিন, আবুল বশর, বুরহান উদ্দিন, আবুল কালাম, আমার সহপাঠী আব্দুল কুদ্দুস,  রইছ উদ্দিন চাচাজি, মুহিদ রাজা ভাই সাহেব, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আব্দুর রহমান ভাই, হাসান, মাহবুবুর রহমান, মোস্তাক, আলম সহ সন্মানিত আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা হলো। আবুধাবি থেকে দেখা করার জন্য নিজের গাড়ি নিয়ে ছুটে এলো প্রিয় সালিক। সে গাছবাড়ি দক্ষিণ বাজারের ব্যবসায়ী ছিলো। দেশে থাকাকালীন আমি তার দোকানে প্রায়ই আসা-যাওয়া করতাম। সালিক আমাকে খুব বেশি শ্রদ্ধাভরে দেখে। ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে সেলফি তুললো। গাছবাড়ি মডার্ণ একাডেমির আমার সহপাঠী আশফাক আহমদ মোবাইলে কল করে দেখা মোলাকাত করেছে।
আরেকবার রাতে গেলাম দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার আল আওয়ের ফ্রুট অ্যান্ড ভেজিটেবল মার্কেটে। তখন রাত ১২টা। চারপাশে ট্রাক, ক্রেট ভর্তি টমেটো, পেঁয়াজ, আপেল, আঙ্গুর, খেজুর।
এখানে আমার এলাকার অনেক ভাই, চাচা  কাজ করেন। ভেজিটেবল ও ফ্রুটস এর ব্যবসা করেন। আমাকে দেখে সবাই দোকান থেকে ফল-মূল হাতে ধরিয়ে দিলেন। কেউ বললেন, “ভাই, ইউরোপের খবর বলেন”। এই বাজারে রাতেই পুরো দুবাইয়ের হোটেল-রেস্টুরেন্টের মালামাল যায়। পরিশ্রমী বাংলাদেশীদের আরেক রূপ দেখলাম। এই মার্কেটে আমার বড় চাচাজি নুরুল ইসলাম দীর্ঘ দিন ব্যবসা করেছিলেন। আমার শ্রদ্ধেয় আব্বা এবং চাচাজিদের প্রবাস জীবনের  দীর্ঘ দিনের স্মৃতি রয়েছে দুবাইতে। একারণেই মানুষ আমাকে প্রাণ ভরে ভালোবাসা দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
চায়না মার্কেটে এক চক্কর :
এক দিন রোদ মাখা সকালে  ঘুরতে গেলাম চায়না মার্কেট। ৫ তলা বিশাল মার্কেট। এখানে গিয়েই বেশ কয়েক জন রেমিট্যান্স যোদ্ধার সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে।
মিস্টার আব্দুস শাকুর ইলেকট্রনিক্স ব্যবসা করেন। আবুল হাসনাত ভাইয়ের পর্দার দোকান, বাবুল রানা চৌধুরী ভাইয়ের স্পোর্টস এর দোকান, মুজিব ভাইয়ের ঘড়ি ও চশমার দোকান, আরিফ চাচার গিফট আইটেমের দোকান, মুকিতের কাপড়ের দোকান, আব্দুল্লাহ আল মামুনের দোকান, আব্দুল হালিমের দোকান, আরিফ চাচার দোকান।
দুবাইতে আমার ভাগ্না সাইফ উদ্দিন সাইফুল  তাঁর বাসায় আমন্ত্রণ করে গরুর বিরিয়ানি, মুরগির রোস্ট, কাচ্চি দিয়ে ডিনার করিয়েছেন। একসাথে বসে আমরা ১০ জন তৃপ্তির সহিত খাবার খেয়েছি। জম্পেশ আড্ডা জমে উঠেছিল সেদিনের সন্ধ্যায়।
দুবাইয়ের কয়েকটি পর্যটন স্পট ও আমার স্মৃতি :
বুর্জ খলিফা :
বুর্জ খলিফা- পৃথিবীর ছাদ।
আমার  ছবিটা এখানকারই। রাত ৯টা। সামনে দাঁড়িয়ে আছি বুর্জ খলিফা। ৮২৮ মিটার, ১৬৩ তলা। জীবনে প্রথমবার বুর্জ খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মাথা উঁচু করে উপরে তাকালে আকাশ ছুঁয়ে যায় মনে হয়। সামনে পুরো দুবাই। ডানে পাম জুমেইরা, বাঁয়ে দুবাই মেরিনা। বুর্জ খলিফার নিচে কয়েক বার  তাকিয়েছি। রাতের বুর্জ খলিফা গায়ে হাজারো আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো ওটা দুবাইয়ের মুকুট। আর আমি সেই মুকুটের পায়ের কাছে দাঁড়ানো এক বাংলাদেশি।
দুবাই মল :
বুর্জ খলিফার কাছেই দুবাই মল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মলগুলোর একটা। ভেতরে ঢুকে প্রথমে হারিয়ে গিয়েছিলাম। ভেতরে প্রথমেই চোখে পড়ল দুবাই অ্যাকুয়ারিয়াম। ১০ মিলিয়ন লিটার পানির ট্যাংক। তার ভেতরে হাঙর, রে মাছ সাঁতার কাটছে। মানুষ কাঁচের টানেল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর মাথার উপর দিয়ে মাছ যাচ্ছে। বাচ্চাদের মতো আমিও ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে দেখেছি। এরপর হাঁটা। ১২০০ এর বেশি দোকান। গুচি, প্রাডা, অ্যাপল—সব ব্র্যান্ড এক ছাদের নিচে। মলের মাঝখানে বিশাল ঝর্ণা। প্রতি ৩০ মিনিট পরপর পানির নাচ। আর সাথে মিউজিক। বিকেল ৬টায় যখন “All I Ask” গানটা বাজল, পুরো মল থেমে গেল। হাজার মানুষ মোবাইল তুলে ভিডিও করছে। আমিও করলাম। ফুডকোর্টে গিয়ে দেখি দুনিয়ার সব খাবার। বিরিয়ানি, শাওয়ারমা, সুশি, পাস্তা। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টও আছে। মাছ, মাংস, ভাত-ডাল, সব্জি, চা নাস্তা সবই আছে। সবচেয়ে অবাক লাগল VR পার্ক আর কিডজানিয়া দেখে। বাচ্চারা এখানে ডাক্তার, পাইলট, ফায়ার ফাইটার সাজে। রাত ১০টায় বের হওয়ার সময় আবার বুর্জ খলিফার দিকে তাকালাম। মলের লেজার শো চলছে। পানির উপর আলো আর গানের খেলা। দুবাই মল আমাকে শিখিয়েছে, ব্যবসা মানে শুধু বিক্রি না। এটা অভিজ্ঞতা বিক্রি। মানুষ এখানে জিনিস কিনতে আসে না, স্মৃতি কিনতে আসে। আর আমি? আমি একটা স্মৃতি আর এক কাপ সিলেটি চা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম।
দুবাই গোল্ড সুখ মার্কেট :
আবুল হাসনাত ভাই ও মহি উদ্দিন আহমদ  ভাইয়ের গাড়িতে করে আমরা ৫ জন গেলাম পুরনো দুবাই দেইরাতে। দুবাই গোল্ড সুখ মার্কেট। পুরো রাস্তা জুড়ে শুধু সোনার দোকান। আমাদের সিলেটের বিজিত দাদা  স্কাই জুয়েলারিতে জব করেন। সেই দোকান থেকে আমি কয়েক ভরি সোনা ক্রয় করলাম। আমার ছোট ভাই সুয়েব এর বিয়ের জন্য। পাশেই স্পাইস সুখ।
কোরানিক পার্ক :
সবচেয়ে শান্তির জায়গা কোরানিক পার্ক। আল খাওয়ানিজ এলাকায়। পার্কের মেইন গেটের সামনে সোনালি অক্ষরে লেখা QURANIC PARK। গ্লাস হাউস এর ভেতরে মরুভূমির গাছ। কেভ অফ মিরাকলস এ কোরআনের ৬টি মুজিজার কথা লেখা।
দুবাই ফ্রেম :
পুরনো দুবাই আর নতুন দুবাইকে এক ফ্রেমে দেখার জায়গা দুবাই ফ্রেম। ১৫০ মিটার উঁচু সোনালি ফ্রেম।
দুবাই সাফারি পার্ক :
গরমের দুপুরে দুবাই সাফারি পার্কে ঢুকতেই মনে হলো যেন আফ্রিকায় চলে এসেছি। বাসের জানালা দিয়ে সিংহ, জিরাফ, জেব্রা—সব পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। মরুভূমির মাঝে এত সবুজ আর প্রাণ। মানুষ চাইলে মরুতেও নয়নাভিরাম চিড়িয়াখানা বানাতে পারে। ১৯ হেক্টর জায়গায় চিড়িয়াখানা।
দুবাই মেরিনা :
রাতের দুবাই মেরিনা মানে আলোর নদী। উঁচু উঁচু টাওয়ারের গায়ে রঙিন লাইট। ইয়টগুলো পানিতে দুলছে। পাশ দিয়ে দামি গাড়ি যায়। মেরিনার পানি দেখে সিলেটের প্রবাসীদের মনে পড়ে সুরমা নদী। প্রবাসেও যে সৌন্দর্য থাকে, মেরিনা তার প্রমাণ। রাতের রকমারি আলোয় দুবাই মেরিনা। ডাও ক্রুজ এ ডিনার করতে বহু পর্যটক ভিড় করেন।
লা মের বিচ :
লা মের বিচে গিয়ে পা ভিজান অনেকেই। নীল পানি, সাদা বালি আর দূরে বুর্জ আল আরব। অনেক বাংলাদেশি পরিবার পিকনিক করে। বাচ্চারা ফুটবল খেলে। কেউ চুপচাপ বসে ঢেউ গুনে। সমুদ্র সব দেশেই এক, কিন্তু প্রবাসের সমুদ্রের ঢেউয়ে দেশের কান্না মিশে থাকে। সমুদ্রের পাড়ে রঙিন দেয়াল, স্ট্রিট ফুড।
গ্লোবাল ভিলেজ :
গ্লোবাল ভিলেজ মানে এক রাতে পুরো পৃথিবী। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। নকশীকাঁথা, জামদানি, চায়ের কাপ, বাউল গান। পাশেই সৌদির খেজুর, ভারতের শাড়ি। দুবাই আমাদের শিখিয়েছে ভিন্নতা নিয়েও একসাথে থাকা যায়। দুবাইয়ে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এটাই আসল বিশ্ব। পৃথিবীর ৯০টি দেশের প্যাভিলিয়ন গ্লোবাল ভিলেজ।
জুমেইরা মসজিদ :
শুভ্র সাদা জুমেইরা মসজিদ। দুবাইয়ের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদগুলোর একটা। ভেতরের কারুকাজ দেখে চোখ জুড়ায়। এই মসজিদ দেখলে বোঝা যায়, দুবাই শুধু টাকার শহর না, এটা ইমানেরও শহর।
পাম জুমেইরা :
দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময় পাম জুমেইরা। উপর থেকে দেখলে মনে হয় খেজুর গাছের মতো একটা দ্বীপ ভাসছে সমুদ্রে। দুই পাশে বিলাসবহুল ভিলা আর আটলান্টিস হোটেল। নিচে নীল সমুদ্র।
পামে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, মানুষের স্বপ্ন আর টাকা এক হলে মরুভূমির বুকেও সমুদ্র জয় করা যায়। এখানকার প্রতিটা বালুকণা বলে দেয়—অসম্ভব বলে কিছু নেই।
মিরাকেল গার্ডেন :
মরুভূমির মাঝে ফুলের রাজ্য—এটাই দুবাই মিরাকেল গার্ডেন। ৭২ মিলিয়ন ফুল দিয়ে বানানো। এয়ারবাসের মডেল, মিকি মাউস, দিল্লির তাজমহল—সব ফুল দিয়ে তৈরি।
প্রথমে ঢুকে চোখ আটকে গিয়েছিল। এত রং, এত গন্ধ! গরমের দেশে এত পানি আর ফুল কিভাবে সম্ভব? গার্ডেনের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ছিল সিলেটের চা-বাগান। প্রকৃতি যেখানেই থাকুক, মানুষের মন জুড়ায়। বিকেলের আলোয় ফুলের উপর যখন রোদ পড়ে, তখন অসাধারণ লাগে।
আমার এলাকার বহু প্রবাসী দুবাইতে ব্যবসা করেন। চাকুরিরত আছেন। আল রাশিদিয়া, আল কারামা, দেইরাতে অনেকের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। মতবিনিময় হয়েছে।
কৃতজ্ঞতা :
এই সফরে যাঁরা আমাকে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ।
বিশেষ করে মিস্টার হারুন রশিদ ভাই সাহেব , বাবুল রানা চৌধুরী ভাই, আবুল হাসনাত ভাই, ব্যবসায়ী মামুন রশিদ ভাই, কাওসার মাসুম, মিস্টার আব্দুস শাকুর, আমার সহপাঠী আব্দুল মালিক ভাই, আমার ছোট চাচাজি নজমুল ইসলাম বাবুল, কবির সেঠ মামা, আমার চাচাতো ভাই কামাল উদ্দিন, জসিম উদ্দিন, সেলিম উদ্দিন, বুরহান উদ্দিন  সহ সকল সন্মানিত আত্মীয় স্বজন এবং Al Aweer এর ভেজিটেবল-ফ্রুটস ব্যবসায়ী ভাইয়েরা, চাচারা।
দুবাই শুধু কংক্রিট আর কাঁচের শহর না। এটা স্বপ্ন দেখার শহর। আর সেই স্বপ্নের পেছনে আছে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঘাম।
বিদায়ের রাত আর টেক্স রিফান্ডের স্মৃতি :
দেখতে দেখতে, ঘুরতে ঘুরতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭ দিন কেটে গেল।  এক সপ্তাহের এই সফর ছিল স্বপ্নের মতো। বুর্জ খলিফার আলো, মরুভূমির সোনালি বালি, দুবাই মেরিনার রাতের ঝলমল — সব কিছু চোখের সামনে সিনেমার মতো ভাসছে।
রাত ১০ টা। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এর ডিপার্চার গেটে দাঁড়িয়ে আছি। মনটা ভারী। কারণ বিদায় জানাতে এসেছেন ৩ জন প্রিয় মানুষ। প্রথমেই বাবুল রানা চৌধুরী ভাই। সারাটা সফরে যিনি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। হাসিমুখে বললেন, “ভাই, পুরোপুরি খেদমত করতে পারলাম না। আবার আসবেন। দুবাই আপনার অপেক্ষায় থাকবে।”
তারপর আবুল হাসনাত ভাই। শান্ত, ভদ্র মানুষ। তিনি বললেন, “দেশে গিয়ে পরিবারকে আমার সালাম দিবেন।”
আর ছোট ভাই শরিফ। সারাক্ষণ খোশমেজাজে গল্প করা,  গাড়ির দরজা খোলা, পানি এগিয়ে দেওয়া — নিজের বড় ভাইয়ের মতো খেয়াল রেখেছে। ৩ জনের চোখেই মায়া। প্রবাসে থেকেও দেশের মানুষের প্রতি এই টান দেখে বুকটা ভরে গেল।
আমি ফ্লাইটের কিছুটা আগে এয়ারপোর্টে প্রবেশ করেছি। মনে পড়লো, দুবাইতে কেনাকাটার সময় বিজিত দাদা বলেছিলেন, “ভাই, সোনা কিনলে ট্যাক্স রিফান্ড নিয়ে যাবেন।” তাই সোজা চলে গেলাম _ট্যাক্স রিফান্ড অফিসে। লাইনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস আর কেনাকাটার রিসিট জমা দিলাম। অফিসার মেশিনে স্ক্যান করে দেখলেন। তারপর হাসিমুখে বললেন, “Sir, your VAT refund is approved.”
পরের দিনে ভিসা কার্ডে পেয়ে গেলাম ক্রয় করা সোনার ট্যাক্স রিটার্ন। দুবাইতে সোনা কেনার উপর যে ৫% ভ্যাট দিয়েছিলাম, তার পুরোটাই ফেরত পেলাম। সত্যি বলতে, ছোট অংক না। প্রবাসী ভাইদের জন্য এটা অনেক বড় সাপোর্ট। দুবাই সরকারের এই নিয়মটা অসাধারণ। পর্যটক ও প্রবাসী সবাই উপকৃত হয়। দুবাই শুধু সোনার শহর না, এটা নিয়ম-কানুন আর আন্তরিকতারও শহর।
দুবাইয়ের আনন্দঘন পরিবেশ, আতিথেয়তা, আর প্রবাসী ভাইদের ভালোবাসাকে পেছনে ফেলে রওয়ানা দিলাম প্রিয় মা, মাটি ও মানুষের কাছে। প্রিয় বাংলাদেশের কাছে।
প্রবাসে গেলে বোঝা যায়, দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা নিজের দেশ। আর সবচেয়ে আপন মানুষ নিজের মানুষ। #
ছবির ক্যাপশন:
ছবি ১: ২০১৯ সাল। রাতের বুর্জ খলিফা এর সামনে লেখক
ছবি ২: ২০১৯ সাল। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এ বাংলাদেশী কমিউনিটির ফুলেল শুভেচ্ছা