প্রচ্ছদ

জীবনের কথা, পর্ব-২৪

  |  ১৩:১০, জুন ২৫, ২০২০
www.adarshabarta.com

Manual5 Ad Code

লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক ও শহীদ মিনার একই সূত্রে গাঁথা

Manual2 Ad Code

:: মোঃ রহমত আলী ::

Manual4 Ad Code

শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলি যেভাবে সন্তানদেরকে আগলে রাখার অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে সেভাবে লন্ডনের আলতাব আলী পার্কও যেন লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত শহীদ মিনারকে আগলে রেখেছে। কারণ এ শহীদ মিনারটি উক্ত পার্কের মধ্যে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে । বাঙালী ছাড়াও অবাঙ্গালী যারা এ পার্কে যাচ্ছে বা পাশের রাস্তা অতিক্রম করছে তারা আড় নয়নে চেয়ে দেখে নেয় এ মিনারটি। কেউ কেউ আবার একটু অগ্রসর হয়ে এর গায়ে কি লেখা আছে তা এক নজর পড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। অনেকে আবার এর পাদদেশে বসে গল্প গুজব করছে, নয়তবা পানাহারে লিপ্ত রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় বাঙালীদের জন্য এটি গর্বের বিষয় হলেও দূর থেকে যারা এখানে আসেন তারা লন্ডনের মত জায়গায় এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় গর্বের সাথে অহঙ্কারও করে থাকেন। নতুন প্রজন্মের স্কুল পড়–য়া ছেলেমেয়েদের এখানে নিয়ে আসা হয় বাঙালীর ইতিহাস জানাতে। মোটকথা, সকলের জন্যই এটা একটা বৈচিত্রপূর্ণ বিষয়। এ শহীদ মিনারটি ও আলতাব আলী পার্কের মূল ইতিহাসও প্রায় সমপর্যায়ের। শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা করা হয় দেশে বাংলাভাষা আন্দোলনের স্মারক হিসাবে এবং আলতাব আলী পার্ক করা হয়েছিল বৃটেনে বর্ণবাদীদের হাতে নিহত নিহত আলতাব আলীর স্মৃতির প্রতিক হিসাবে। এগুলি আবার একই স্থানে ইস্টলন্ডনের বাঙালী অধ্যুসিত এলাকায় অবস্থিত। যার আশপাশেই রয়েছে বাংলা টাউন, কবি নজরুল স্কুল, নজরুল সেন্টার ও ওসমানী স্কুল ও মিলনায়তন প্রভৃতি।

Manual3 Ad Code

১৯৭৮ সালে যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এ দেশ থেকে বহিরাগতদের বের করে দেয়ার জন্য উগ্রডানপন্থিরা মরিয়া হয়ে উঠে। তারা রাস্তাঘাটে এমনকি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আক্রমন করতে থাকে বহিরাগতদেরকে। এর ধারাবাহিকতায় ইস্টলন্ডনের বাঙালী অধ্যুসিত এলাকায়ও তারা বর্ণবাদী কর্মকান্ড শুরু করে। সে সময় অনেকে ঘর থেকে বের হতেন না, অথবা একাকী চলাফেরা করতেন না। কাজে যাওয়ার সময়ও সংঘবদ্ধ হয়ে যেতেন।

এমতাবস্থায় আলতাবা আলী একদিন কাউকে সাথে না পেয়ে সাহস করে কাজে চলে যান। সেভাবে একাই পায়ে হেঁটে নিজ ঘরে ফিরে আসার সময় বর্ণবাদীদের আক্রমনের শিকার হন। তাকে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ফলে তিনি রক্তাক্ত হয়ে মাঠিতে পড়ে যান। এভাবে অনেক্ষণ তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এরপর তারা পালিয়ে যায়। এদিন তারিখ ছিল ৪ মে ১৯৭৮। দিন ছিল বৃহষ্পতিবা, সময় ছিল সন্ধ্যা ৭টা। স্থান ছিল বর্তমান আলতাব আলী পার্ক সংলগ্ন এডলার ষ্ট্রিট। এর পুরাতন নাম ছিল সেন্ট মেরিজ পার্ক।

এ ঘটনার পর স্থানীয় বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বাঙালীরা তখন সংঘবদ্ধ হয়ে এর প্রতিবাদ করতে থাকেন। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সবাই তখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। এ সময় বাঙালী যুবকরা তখন এর প্রতিবাদ মরণপন আন্দোলনে অংশ নেয়। প্রায় প্রতিদিনই সংঘবদ্ধ হয়ে এর প্রতিবাদ জানাতে থাকেন সবাই। ১৪ মে আলতাব আলীর লাশ নিয়ে প্রায় ৭ হাজার মানুষ ব্রিকলেন থেকে মিছিল করে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রীর অফিস ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট অভিমূখে যায়। অন্যান্য কমিউনিটির লোকও এতে যোগ দেয়। তখন বর্ণবাদীরা কিছুটা পীছু হটতে বাধ্য হয়।

এরপর দাবী উঠে আলতাব আলীকে যে স্থানে হত্যা করা হয়েছে সে স্থান সংলগ্ন এই পার্ককে তার নামে নামকরণ করার। এক পর্যায় নামকরণ করা হলেও সরকারীভাবে এর স্বীকৃতি আদায় করতে প্রায় অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়। তখন স্থানীয় টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে ধীরে ধীরে বাঙালী কাউন্সিলারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে আর তাই ১৯৯৮ সালে সেই নামকরণ সরকারীভাবে অনুমোদন করা হয়।

এরপর ২০১৬ সালের ৪ মে মেয়র জন বিগস এ দিনটিকে আলতাব আলী দিবস হিসাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষনা প্রদান করেন। বর্তমানে স্থানীয় বাসস্টেন্ডটিও আলতাব আলী পার্কের নামে নামকরণ করা হয়েছে। তাই বাসযাত্রাকালে এর কাছে আসলে বাসে বসে শুনা যায় ‘আলতাব আলী পার্ক’।

Manual7 Ad Code

এদিকে লন্ডনের একটি স্থানীয় শহীদ মিনার তৈরীর জন্য দীর্ঘদিন থেকে প্রচেষ্টা চলছিল। এর আগে স্থানীয় হ্যানবারী ষ্ট্রিটের হ্যানবারী ষ্ট্রিটের একটি হলে অস্থায়ীভাবে শহিদ মিনার তৈরি করে শহীদ দিবস পালন করা হতো। সেটি ছিল “সাড়ে বায়ান্ন হ্যানবারী স্ট্রিট”। অন্যান্যদের সাথে আমিও তাতে যোগ দিতাম আর একজন সাংবাদিক হিসাবে ছবি তুলতাম ও সংবাদ সংগ্রহ করতাম। তবে ১৯৯৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী এ আলতাব আলী পার্কে শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৯৯ সালে তা সমাপ্ত হয়। তখন থেকেই এখানে স্থায়িভাবে শহীদ দিবস পালনের কর্মসূচী শুরু হয়। তবে এটি যুক্তরাজ্যে স্থায়িভাবে প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় শহীদ মিনা । তার আগে ওল্ডহ্যামে প্রথম শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্থানীয় টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সহযোগিতায় যে সমস্ত সংগঠন এতে আর্থিক সহযোগিতা করে সেগুলি হচ্ছে, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ সেন্টার, ঢাকা এসোসিয়েশেন, চট্টগ্রাম এসোসিয়েশন, ব্রিকলেন বিজনেস এসোসিয়েশন, কালেকটিভ অব স্কুল গভর্ণর, সাহিত্য পরিষদ, বৃহত্তর নোয়াখালী এসোসিয়েশন, সেন্টমেরী সেন্টার, রেডব্রিজ বেঙ্গলী ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বিশ^বাঙালী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলাদেশ টিচার্স এসোসিয়েশন, উদিচী শিল্পি গোষ্ঠী, বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি যুক্তরাজ্য শাখা, বিশ^নাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট, বৃহত্তর ছাতক সমিতি, শ্রীরামসি ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, সিলেট সদর এসোসিয়েশন, গোলাপগঞ্জ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, হবিবপুর কল্যাণ পরিষদ, বুধবারী বাজার ইউনিয়ন উন্নয়ন পরিষদ, লন্ডন কচিকাচার মেলা, যুক্তরাজ্য জাতীয়তাবাদী দল, সোনালী ব্যাংক, জগন্নাথপুর উন্নয়ন সংস্থা, বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি, বানিগ্রাম পল্লী মঙ্গল সমিতি, ইস্ট এন্ড ইয়ূথ অর্গেনাইজেশন, মিডিল সেক্স বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বিশ্ব বাংলা একাডেমী, নারী সমিতি, নারী সংগ্রাম, ইস্ট এন্ড কমিউনিটি স্কুল প্রভৃতি। শহীদ মিনার বাস্তবায়র লক্ষ্যে নামোল্লিখিত সংগঠনের কাছ থেকে ৫০০ পাউন্ড করে প্রদান করা হয়। তবে এ সময় অনেক সংগঠন এ চাঁদা দিতে পারে নাই বলে নাম যুক্ত হয় নাই। তবে তারা অন্যান্য দিকে সহযোগিতা করেছে। যার ফলে এ শহীদ মিনারটি প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও শহীদ দিবস পালন করা সম্ভব হচ্ছে।

এরপর যখন এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয় তখন ১৯৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের তৎকালীর স্পীকার আলহাজ¦ হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী এবং স্থানীয় এমপি উনা কিং যৌথভাবে এর উদ্বোধন করেন। এ সময় যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এ এইচ মাহমুদ আলী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা: আমান উল্লা, সৈয়দা জেবুন্নেছা হক এমপি সহ স্থানীয় কাউন্সিলের, স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ সহ বিপুল পরিমান লোকজন উপস্থিত ছিলেন। এ সময় টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের আর্টস, স্পোর্টস লেইজার কমিটির চেয়ার ছিলেন, কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী এবং কাউন্সিল লিডার ছিলেন মাইকেল কীথ। (চলবে)।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রবীণ সাংবাদিক ও দর্পণ ম্যাগাজিন সম্পাদক। ইমেইল: rahmatali2056@gmail.com

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code