দিগন্ত ভ্রমণের স্মৃতি, পর্ব-০১
প্রাচীন প্রাসাদের নগরী কলকাতা :
জন্মভূমি থেকে বিদেশে প্রথম ভ্রমণের স্মৃতি
দেলওয়ার হোসেন সেলিম ✍️
ইটের পর ইট, তার মাঝে প্রাচীন ঐতিহ্যের ছাপ। সুরম্য অট্টালিকা, ভিক্টোরিয়ান আমলের রাজকীয় দালান, আর জাঁকজমকপূর্ণ ইতিহাসের রাজকীয় আবহ— সব মিলিয়ে কলকাতা আসলেই প্রাসাদের নগরী। ইতিহাস আর বিজ্ঞান পাশাপাশি হাঁটে যে শহরে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী এই কলকাতা শহরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন। কলকাতা দেখতে বাংলাদেশ থেকে বহু পর্যটক প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমান ওপার বাংলায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অসংখ্য পর্যটক ভ্রমণে আসেন কলকাতায়।
ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এই শহর যেন এক অনন্ত বিস্ময়ের ভাণ্ডার। তাই সুযোগ পেতেই মনের কোণে জমে থাকা প্রাচীন প্রাসাদ ও ঐতিহ্য দেখার সুপ্ত বাসনা নিয়ে পা বাড়িয়েছিলাম এই ঐতিহ্যবাহী নগরীতে।
২০০২ সাল। আমি প্রথমবার কলকাতা ভ্রমণে গিয়েছিলাম। তখন অসহ্য গরমের দিন ছিল। সম্ভবত পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। আর সেই গরম তাপ প্রবাহ কেড়ে নিয়েছিল বেশ ক’জন ভারতীয় মানুষের প্রাণ। তখনও কলকাতা ঘুরে দেখার প্রবল ইচ্ছা আমাকে থেমে রাখতে পারেনি। ভারতীয় হাই কমিশন থেকে পাসপোর্টে ভিসা পেয়ে এবং প্লেনের রিটার্ন টিকেট করে রওয়ানা হলাম সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর থেকে। বেলা ২টা ২৫ মিনিটে সিলেট থেকে জিএমজি এয়ারলাইন্সের ঢাকা পর্যন্ত ডোমেস্টিক ফ্লাইট ছিল।
আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডশিপ এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার নজরুল ইসলাম এসেছে আমাকে সাময়িক বিদায় জানাতে। ফ্লাইটের নির্দিষ্ট সময়ের দু’ ঘন্টা আগেই সিলেট এয়ারপোর্টে পৌঁছে সেখানে দেখা হল খ্যাতিমান লেখক সাংবাদিক জুয়েল সাদত ভাইয়ের সাথে। দুই/ তিন বছর আমেরিকায় প্রবাসী দিন অতিবাহিত করে দেশে এসেছেন তিনি। বললেন, পত্রিকায় তোমার বিদেশ ভ্রমণের নিউজ দেখে বিদায় দিতে এসেছি। তাঁর সাথে আলাপ আলোচনার একপর্যায়ে আমার ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এসেছিল। সোজা প্লেনের সিটে গিয়ে বসতে অনুরোধ জানালেন জিএমজি এয়ারলাইন্সের একজন অফিসার। দ্রুত প্লেনের দিকে এগোলাম। জিএমজি এয়ারলাইন্সের ক্রু গেটে স্বাগত জানালেন। নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করল প্লেনটি। মাত্র ৩৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম ঢাকা জিয়া আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে। পরবর্তীতে এই এয়ারপোর্টের নামকরণ করা হয়েছে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট।
ঢাকা থেকে কলকাতার ফ্লাইট এর টিকেট ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। ঐদিন সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় দীর্ঘ সময় ঢাকা এয়ারপোর্টে ট্রানজিট লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করলাম। যথা সময়ে বিমানের কাউন্টারে রিপোর্ট করি এবং বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করি। এরপর মাইকে এনাউন্সমেন্ট শোনে ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করে সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়ালাম। প্রয়োজনীয় চেক আপ অর্থাৎ পাসপোর্ট, ভিসা, টিকেট পরীক্ষার পর ইমিগ্রেশন অফিসার শুরু করলেন কত জিজ্ঞাসা! অবশেষে ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে আসায় ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পাসপোর্টে ডিপারচার সিল মারলেন। এরপর বিমানে উঠে নির্দিষ্ট সিটে বসলাম। এতক্ষণ কি যে টেনশন এর মধ্যে ছিলাম। এই মুহূর্তে কিছুটা রিলাক্স লাগল। মনে হল কখন পৌঁছাব সেই গন্তব্যে। কলকাতা ভ্রমণ আমার জীবনের প্রথম দেশের বাইরে ভ্রমণ। তাই বেশ আনন্দ লাগছিল। অবশ্য একা ভ্রমণে যাচ্ছি বিদেশে সেজন্য কিছুটা ভয়ও ছিল।
যাই হোক। এই ভ্রমণ আসলে ছিল আনন্দ ও রোমাঞ্চের কাঙ্ক্ষিত মিশ্রণ। মনে বারবার উঁকি মারে এই কথা। রোমন্থন করব জীবনের স্মৃতিময় ক’টা আনন্দের দিন। যেখানে মাসব্যাপী উপভোগ করব নিজেকে সইয়ে সইয়ে অবকাশের প্রতিটি মুহূর্ত। নানান তথ্য, স্মৃতি ডায়েরিতে লেখা হবে। ক্যামেরাবন্দি করব। কত কি?
কিছুক্ষণ পরে বিরাট আকারের বিমানটি ধীরে ধীরে কয়েকবার চক্কর দিল রানওয়েতে। তারপর হঠাৎ করে অধিক গতিতে বিমানটি ঊর্ধ্বমুখী ছুটে চলল। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্লেনটি এক ঘন্টা চলার পর কলকাতায় পৌঁছে যাত্রা বিরতি করবে এবং পরে সৌদি আরবে পৌঁছাবে। প্লেনটিতে আমি সহ কলকাতা গামী যাত্রী মাত্র কয়েকজন ছিলাম। বিমানটি ভূমি থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপর দিয়ে চলছে। বিমানবালা যাত্রীদের সেবায় খুবই তৎপর মনে হয়েছে। সকল যাত্রীদের ম্যাংগো জুস, অরেঞ্জ জুস, কোল্ডড্রিংক সরবরাহ করা হলো। এরপর ব্রেকফাস্ট প্যাকেট ও চা বিতরণ করা হলো। বিমানে আমার পাশের যাত্রী ছিলেন জেদ্দা শহরে কর্মরত একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা। তাঁকে বেশ চিন্তামগ্ন দেখেও নীরব থাকতে পারিনি। শুরু হলো আলাপ পরিচয় পর্ব। তিনি আমাদের প্রতিবেশী জৈন্তাপুর উপজেলার অধিবাসী। আলাপকালে তিনি বলেন, পরিবার-পরিজনদের নিয়ে কয়েক মাস ছুটি কাটিয়ে আবারও প্রবাসে ফিরে যাচ্ছেন। একথা শোনে আমি দোয়া এবং শুভকামনা জানালাম। এরই মধ্যে উড়ন্ত বিমানের জানালা দিয়ে দেখি সাদা মেঘেরা তুলোর মত ভেসে বেড়াচ্ছে। যেন হাত বাড়ালেই মুটিমুটি মেঘের তুলো উঠিয়ে আনা সম্ভব। নানান কথার উপদ্রবে স্মৃতির মনিকোটায় ভাসতে ভাসতে প্রায় চলে এসেছি গন্তব্যে। বিমানের ভেতর থেকে কলকাতা নেতাজি সুভাষ বসু আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট এর রকমারি আলো চোখে পড়ল। প্লেনটি নিরাপদে ল্যান্ড করলো। আলহামদুলিল্লাহ।
বিমান থেকে নেমে প্রথমে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে নিলাম। কলকাতার স্থানীয় সময় বাংলাদেশ সময় থেকে আধা ঘন্টা পিছনে। এয়ারপোর্ট চত্বর থেকে একটি পুরাতন লক্ষর যন্ত্রের মাইক্রোবাস ভটভট শব্দ করে আমাদেরকে ইমিগ্রেশনের দরজায় নিয়ে গেল। কলকাতা এয়ারপোর্ট এর বাইরের চাইতে ভেতরটা দেখতে খুবই সুন্দর লাগলো। এই এয়ারপোর্টের নাম আগে দমদম এয়ারপোর্ট ছিল। এখন নেতাজি সুভাষ বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর নামকরণ হয়েছে।
আমার পাসপোর্ট টিকেট হাতে নেয়ার পর ইমিগ্রেশন অফিসার ঘুরতে এসেছি শোনার পর বন্ধুসুলভ আচরণ করলেন। আমাকে কলকাতায় ওয়েলকাম জানালেন।
কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। সড়ক পথে যাত্রাকালে বাইরে থাকালে চোখে পড়ল বিশাল শহর। রিকশা, ট্যাক্সি, হলুদ অ্যাম্বাসেডর গাড়ি, ট্রাম – সবকিছুই যেন একটা আলাদা জগৎ। প্রথমবার বিদেশের মাটিতে পা রেখে সবকিছুই নতুন লাগে। বাতাসের গন্ধটাও আলাদা মনে হয়। মিটার চালিত ট্যাক্সি যোগে পৌঁছে গেলাম কলকাতার প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেট এলাকায়। নিউ মার্কেট সংলগ্ন মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট ও রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড এলাকায় রয়েছে বাংলাদেশি পর্যটকদের উপযোগী অসংখ্য হোটেল।
আমার মামাতো ভাই আফসর চৌধুরী তাঁর পরিচিত হোটেলের ঠিকানা দিয়েছিল। হোটেলটি ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে অবস্থিত। নাম সেন্টার পয়েন্ট গেস্ট হাউস। এই হোটেলের টপ ফ্লোরে হালাল খাবারের সুব্যবস্থা আছে। রুফ টপ রেস্টুরেন্ট নামে সাইনবোর্ড থাকলেও এটি হাজী সাহেবের রেস্তোরাঁ হিসেবে প্রসিদ্ধ। সেন্টার পয়েন্ট গেস্ট হাউসে থাকার জন্য সিট বুকিং করলাম। রিসিপশন থেকে জানতে পারলাম এখানকার ডরমেটরিতে বিভিন্ন দেশের টুরিস্টদের সাথে বাংলাদেশীও কয়েক জন টুরিস্ট আছেন। ডরমেটরির নিয়ম কানুন, নিরাপত্তা দিক নির্দেশনা, বিনোদন ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে অবগত হয়ে রুম ভাড়ার পরিবর্তে ডরমেটরিতে সিট কনফার্ম করেছিলাম। ডরমেটরি হলো একটি হল রুমে, একটি ছাদের নিছে অন্তত ৩০/ ৩৫ জন বিদেশি পর্যটকদের একত্রে বসবাসের সিস্টেম। কাঠের দ্বিতলা পালং। প্রত্যেকের আলাদা সিট, লকার। চমৎকার পরিবেশ। ডরমেটরিতে দেখা হলো, পরিচয় হলো বাংলাদেশী কয়েক জন ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীদের সাথে। এরপর পরিচয় হলো কয়েক জন জাপানি আর ইউরোপীয়ান টুরিস্টদের সাথে। ফরেনারদের সাথে পরিচয়, আলাপ, আলোচনা করে খুবই ভালো লাগলো। জাপানি এক জন কলেজ পড়ুয়া ট্যাংখা। রসিক এই যুবকের কন্ঠে তার নিজের রচিত ইংরেজি গান ” আই লাভ ইন্ডিয়া ” শোনে মুগ্ধ হলাম। এভাবেই ডরমেটরিতে অবসর সময়ে প্রতিদিন রাতের বেলায় বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের নিয়ে আড্ডা জমতো। প্রোগ্রাম পরিকল্পনা রেডি হতো। কে, কখন, কোথায়, কিভাবে ঘুরতে যাবেন, তা নিয়ে আলাপ আলোচনা হতো। মাঝেমধ্যে আমার সাথে ঢাকার মিস্টার স্বপন ভাই এবং কুমিল্লার মিস্টার সুমন ভাই ঘুরতে যেতেন। তাদের সাথে কলকাতায়ই প্রথম দেখা, প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তারা দুজন হাসি খুশি মিশুক মানুষ।
ঐতিহ্য, ইতিহাসের পাতায় প্রাচীন আর আধুনিক প্রাসাদের নগরী কলকাতায় আমার স্বচক্ষে দেখা কয়েকটি টুরিস্ট স্পট সমুহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে উল্লেখ করছি :
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল :
সাদা মার্বেলের তৈরি এই রাজকীয় সৌধ কলকাতার আইকন। ১৯২১ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে তৈরি। ৬৪ একরের বাগান, ফোয়ারা আর বিশাল গম্বুজের উপর দাঁড়িয়ে আছে “Angel of Victory” এর মূর্তি। ভেতরে ২৮টা গ্যালারি। ব্রিটিশ আমলের পেইন্টিং, অস্ত্র, মানচিত্র, রানি ভিক্টোরিয়ার ব্যবহৃত জিনিস দেখে মনে হয় সময়টা থেমে আছে। রাত ৭টায় আলোর খেলায় ভিক্টোরিয়া স্বপ্নের প্রাসাদ হয়ে ওঠে।
হাওড়া ব্রিজ :
গঙ্গার উপর ঝুলন্ত লোহার এই সেতু কলকাতার প্রাণ। ১৯৪৩ সালে তৈরি, কোনো পিলার ছাড়াই ৭০৫ মিটার লম্বা। দিনে ১ লক্ষ গাড়ি আর ১৫ লক্ষ মানুষ পারাপার করে। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ট্রামের শব্দ, নদীর বাতাস আর মানুষের কোলাহল — এটাই আসল কলকাতা। রাতে আলোয় ঝলমল করে ওঠে।
প্রিন্সেপ ঘাট :
হাওড়া ব্রিজের ঠিক নিচে গঙ্গার পাড়ে গ্রিক-রোমান স্টাইলের এই ঘাট। ১৮৪১ সালে তৈরি। বিকেলে এখানে বসে নৌকা দেখা, ফুচকা খাওয়া আর সূর্যাস্তের দৃশ্য ভোলার মতো না। সামনেই বিদ্যাসাগর সেতুর আলো। প্রেমিক-প্রেমিকা আর ফটোগ্রাফারদের প্রিয় জায়গা।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি :
উত্তর কলকাতার এই লাল বাড়ি রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক বাড়ি। এখন “রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়” এর অংশ। ১৮ শতকের এই বাড়িতে কবিগুরু জন্মেছিলেন। ভেতরে তাঁর লেখার টেবিল, পাণ্ডুলিপি, ব্যবহৃত জামা-কাপড়, পারিবারিক ছবি দিয়ে সাজানো জাদুঘর। বাড়ির আঙিনায় দাঁড়ালে মনে হয় রবীন্দ্র সংগীত এখনই ভেসে আসবে।
মার্বেল প্যালেস :
১৮৩৫ সালে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের তৈরি এই রাজবাড়ি কলকাতার লুকানো রত্ন। পুরোটাই ইতালিয়ান মার্বেল দিয়ে তৈরি। ভেতরে ঝাড়বাতি, ভেনিসের আয়না, দুর্লভ অয়েল পেইন্টিং আর ফার্নিচার। একটা ছোট চিড়িয়াখানাও আছে। ঢুকতে আগে থেকে অনুমতি নিতে হয়। রাজকীয় রুচির এক নিদর্শন।
দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির :
গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে ১৮৫৫ সালে রানি রাসমণির তৈরি এই মন্দির। মূল মন্দির ছাড়াও ১২টি শিব মন্দির আছে। এখানেই শ্রী রামকৃষ্ণদেব সাধনা করতেন। সকাল-সন্ধ্যার পুজো, ঘণ্টাধ্বনি আর গঙ্গার হাওয়া মন শান্ত করে দেয়। নৌকা করে ওপারে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও দারুণ।
বেলুড় মঠ :
দক্ষিণেশ্বরের ওপারে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিষ্ঠিত মঠ। ১৮৯৭ সালে তৈরি। মন্দিরের স্থাপত্যে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান তিন ধর্মের ছাপ। মূল মন্দিরের ভেতরে স্বামীজির ব্যবহৃত জিনিস রাখা আছে। সন্ধ্যার আরতি আর গঙ্গার পাড়ের নিস্তব্ধতা আত্মাকে ছুঁয়ে যায়।
নাখোদা মসজিদ :
বড়বাজারের কাছে লাল-সাদা রঙের এই মসজিদ দেখতে মুকুটের মতো। ১৯২৬ সালে তৈরি। ১০০টি গম্বুজ আর ২টি ৪৬ মিটারের মিনার। একসাথে ১০ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে। ফতেপুর সিক্রির আদলে তৈরি। মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
কুমারটুলি :
উত্তর কলকাতার এই পাড়া মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। ৩০০ বছর ধরে এখানে শিল্পীরা হাত দিয়ে দেব-দেবীর মূর্তি গড়েন। দুর্গাপুজোর আগে ৩ মাস এখানে উৎসব লেগে থাকে। কাঁচা মাটির গন্ধ, রঙের কাজ আর শিল্পীদের নিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ হতে হয়।
কলেজ স্ট্রিট – বইপাড়া :
এশিয়ার সবচেয়ে বড় বইয়ের বাজার। ১ কিলো মিটার লম্বা এই রাস্তায় দুই পাশে হাজারো বইয়ের দোকান। *প্রেসিডেন্সি কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যাসাগর কলেজ* সব এখানে। ফুটপাতে ১০ টাকার পুরনো বই থেকে দুর্লভ সংগ্রহ — সব পাওয়া যায়। আর বিখ্যাত *কফি হাউজে* বুদ্ধিজীবীদের আড্ডা। সাহিত্যপ্রেমীদের তীর্থস্থান।
আকাশবাণী ভবন – অল ইন্ডিয়া রেডিও :
গার্ডেনরিচের কাছে ১৯২৭ সালের এই লাল বাড়ি থেকে সারাদিন বাংলা খবর, গান, নাটক, নিউজ প্রচার হয়। “এটি আকাশবাণী কলকাতা” — এই ঘোষণা বাঙালির আবেগ। ভেতরে রেকর্ডিং স্টুডিও, আর্কাইভ দেখার সুযোগ আছে। রেডিওর স্বর্ণযুগের স্মৃতি এখানে জমে আছে।
নন্দন ও রবীন্দ্র সদন :
কলকাতার সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। *নন্দন* মানে বাংলা, হিন্দি, বিদেশি সিনেমার হল। আর রবীন্দ্র সদন মানে নাটক, কবিতা, নাচ। প্রতি বছর কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এখানেই হয়। ক্যান্টিনে ২০ রুপির কফি আর সাহিত্যের আড্ডা — এটাই আসল কলকাতা।
ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম :
১৮১৪ সালে তৈরি এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো মিউজিয়াম। ৬টি সেকশন, ৩৫টি গ্যালারি। এখানে আছে মিশরের মমি, অশোক স্তম্ভ, বুদ্ধের অস্থি, ডাইনোসরের ফসিল, দুর্লভ মুদ্রা। ইতিহাস ভালোবাসলে ৪ ঘন্টা এখানে কেটে যাবে। জ্ঞানের ভাণ্ডার।
ভিক্টোরিয়ার রাজকীয়তা, ঠাকুরবাড়ির সাহিত্য, কলেজ স্ট্রিটের আড্ডা আর আকাশবাণীর গান — সব মিলিয়ে কলকাতা একটা সময়ের ক্যাপসুল। ইটের পর ইটের মাঝে প্রাচীন ঐতিহ্যের ছাপ নিয়েই আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন প্রাসাদের নগরী কলকাতা। কলকাতা মানে শুধু ইট-পাথরের শহর নয়। এটা ৩০০ বছরের ইতিহাস, বিপ্লব, সাহিত্য আর সংস্কৃতির জীবন্ত জাদুঘর। গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটা দালান যেন একটা করে গল্প বলে।
ভাষা ও মানুষ:
কলকাতার আসল প্রাণ কলকাতা শুধু প্রাসাদ আর ব্রিজের শহর নয়, এটা মানুষের শহর। আর এই শহরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর মানুষ আর ভাষা।
কলকাতার মানুষ বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি সহ বহু ভাষায় কথা বলেন। ট্যাক্সিওয়ালা, দোকানদার, হোটেলের বয় — সবার মুখেই মিষ্টি মিশ্রণ। বাঙালি, মারোয়াড়ি, বিহারি, পাঞ্জাবি, তামিল — সবাই মিলেমিশে একসাথে থাকে।
তবে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা। রাস্তার আড্ডা, কফি হাউজ, নন্দনের ক্যান্টিন, আকাশবাণীর খবর — সর্বত্র শ্রুতি মধুর বাংলায় উচ্চারণ শুনে মন ভরে ওঠে।
“আসুন দাদা”, “বসুন”, “চা খাবেন?” — এই ডাকের মধ্যে যে আন্তরিকতা, তা অন্য কোথাও পাইনি।
কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানে বৃদ্ধ দোকানদার যখন রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে বই বুঝিয়ে দেন, তখন বোঝা যায় কেন কলকাতাকে বলা হয় “বাংলা ভাষার রাজধানী”।
আকাশবাণীতে সংবাদ পাঠিকার স্পষ্ট উচ্চারণ, যাত্রাপালার সংলাপ, নাটকের ডায়লগ — সবখানে বাংলা ভাষার মাধুর্য।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতা গিয়ে মনে হয়েছে এটা যেন ভাষার বাড়ি। এখানে বাংলা শুধু কথার ভাষা না, এটা গর্বের ভাষা, আবেগের ভাষা।
প্রাসাদ দেখেছি, গঙ্গার হাওয়া গায়ে লাগিয়েছি। কিন্তু কলকাতা থেকে ফেরার সময় সাথে নিয়ে এসেছি কিছু শ্রুতি মধুর বাংলা শব্দ আর মানুষের উষ্ণ ব্যবহার।
এই ভাষা আর আন্তরিকতাই প্রাচীন প্রাসাদের নগরী কলকাতাকে আমার কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
আধুনিক বিনোদনের কলকাতা :
প্রাচীন প্রাসাদের শহর কলকাতা শুধু ইতিহাসেই আটকে নেই। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর বিনোদনের দিক থেকেও কলকাতা এখন ভারতের অন্যতম আধুনিক শহর। পরিবার নিয়ে একদিনের আউটিং থেকে শুরু করে তরুণদের আড্ডা — সবকিছুর জন্য এখানে আছে দারুণ সব জায়গা।
বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম – বিড়লা তারামন্ডল :
এটা কলকাতার গর্ব। ভিক্টোরিয়ার একদম পাশেই অবস্থিত এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম তারামন্ডল। গোল গম্বুজের ভেতরে বসে ৩৬০ ডিগ্রি স্ক্রিনে মহাকাশ দেখার অনুভূতি অন্যরকম।
এখানে প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজিতে শো হয়। “আকাশের তারা”, “সৌরজগতের রহস্য” — প্রজেক্টরের আলোয় মনে হয় সত্যিই মহাকাশে ভাসছি। ছাত্র-ছাত্রী থেকে বড়রা সবাই মুগ্ধ হয়। টিকেট মাত্র ১২০ রুপি। বিকেল ৪টার শো সবচেয়ে ভিড় হয়।

সায়েন্স সিটি :
বিজ্ঞান আর বিনোদনের পারফেক্ট কম্বো। পূর্ব কলকাতার এই বিশাল কমপ্লেক্সে আছে ৫টা অংশ।
স্পেস থিয়েটার: ভারতের সবচেয়ে বড়। মহাকাশের 3D ছবি দেখে মনে হবে নভোচারী হয়ে গেছি।
টাইম মেশিন: একটা রাইড যেটা আপনাকে নিয়ে যাবে ডাইনোসরের যুগে।
মিরর ম্যাজিক: নিজের শরীর ১০ ফুট লম্বা হয়ে যাওয়া দেখা যায়।
ইভোলিউশন পার্ক: ডাইনোসরের মডেল আর ফসিল।
সারাদিন কাটিয়ে দিলেও বোর হবেন না। স্কুলের বাচ্চাদের জন্য তো আদর্শ জায়গা।
ইকো পার্ক – নিউটাউন :
৪৮০ একরের এই পার্ককে বলে “কলকাতার ফুসফুস”। ৭টি লেক আর চারপাশে সবুজ।
সবচেয়ে আকর্ষণ *”সেভেন ওয়ান্ডার্স”*। তাজমহল, এফিল টাওয়ার, পিরামিড, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি — সবগুলোর রেপ্লিকা এক জায়গায়।
এখানে আছে সাইক্লিং ট্র্যাক, বোটিং, রোপওয়ে, ফুড কোর্ট। বিকেলে লেকের পাড়ে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য বেস্ট। এন্ট্রি ফি ৩০ রুপি।
নিক্কো পার্ক :
কলকাতার “ডিজনিল্যান্ড”। সল্টলেকে অবস্থিত এই অ্যামিউজমেন্ট পার্কে ৩০টির বেশি রাইড।
রোলার কোস্টার, ড্রপ টাওয়ার, ওয়াটার রাইড, 4D সিনেমা — সব আছে। সাহসীদের জন্য “ফ্রি ফল” রাইডটা মাস্ট।
ভেতরে একটা ছোট চিড়িয়াখানা আর লেকও আছে। বন্ধুদের নিয়ে সারাদিন আনন্দের জন্য পারফেক্ট। টিকেট ৫০ রুপি।
পার্ক স্ট্রিট – রাতের কলকাতা :
দিনের কলকাতা আর রাতের কলকাতা দুই রকম। রাত ১০টা পর্যন্ত জেগে থাকে *পার্ক স্ট্রিট*।
দুই পাশে সারি সারি রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, পাব। Peter Cat, Mocambo, Flurys — এখানকার বিখ্যাত খাবারের দোকান।
নিয়নের আলো, গান আর মানুষের কোলাহল। কেনাকাটার জন্য পাশেই সাউথ সিটি মল আর কোয়েস্ট মল।
নিউ মার্কেট – হগ মার্কেট :
১৮৭৪ সালের এই মার্কেট এখনও কলকাতার সবচেয়ে ব্যস্ত শপিং জোন। ২ তলায় ২০০০ এর বেশি দোকান।
জামা-কাপড়, জুতো, ব্যাগ, চকলেট, ইলেকট্রনিক্স — সব পাওয়া যায়। দরদাম করতে হয়। নিচতলায় খাবারের দোকানে *কাঠি রোল আর নান-চিকেন* ট্রাই না করলে মিস।
নন্দন ও রবীন্দ্র সদন :
সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য। *নন্দন* মানে বাংলা-বিদেশি সিনেমা। আর *রবীন্দ্র সদন* মানে নাটক, কবিতা, আবৃত্তি।
এখানকার ক্যান্টিনে ২০ রুপির কফি আর আড্ডা — এটাই আসল কলকাতা। প্রতি বছর কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালও এখানেই হয়।
আধুনিক কলকাতা মানে শুধু শপিং মল আর রেস্টুরেন্ট না। এটা *বিড়লা তারামন্ডলের* আকাশ, *সায়েন্স সিটির* বিজ্ঞান, *ইকো পার্কের* সবুজ আর *পার্ক স্ট্রিটের* আলো মিলিয়ে একটা জীবন্ত শহর।
ইতিহাসের পাশাপাশি ভবিষ্যতকেও বুকে নিয়ে হাঁটছে প্রাচীন প্রাসাদের নগরী কলকাতা। শহর নয়, কলকাতা যেন ইতিহাসের বুক চিরে হেঁটে চলা এক জীবন্ত পাঠশালা। প্রতিটা গলি, প্রতিটা দেয়াল আজও পুরনো দিনের গল্প ফিসফিস করে বলে।
প্রথমবারের ভ্রমণে গিয়ে ঘুরেছি কলকাতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। সাদা মার্বেলের এই প্রাসাদের সামনে দাঁড়ালে সত্যিই মনে হয় সময় এখানে থমকে আছে। হাওড়া ব্রিজ। গঙ্গার উপর দিয়ে ছুটে চলা জীবন, আর ব্রিজের নিচে বয়ে যাওয়া নদী — এই দৃশ্য ভোলার মতো না। প্রিন্সেপঘাট বাবুঘাট থেকে গঙ্গার হাওয়া আর আলো মন ছুঁয়ে যায়। দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির আর বেলুড় মঠ। এই দুই জায়গার পরিবেশ একদম অন্যরকম। ইতিহাস ভালোবাসলে মার্বেল প্যালেস মাস্ট। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য বেস্ট ইকো পার্ক। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য সায়েন্স সিটি। কেনাকাটা আর খাওয়া-দাওয়ার জন্য তো আছেই নিউ মার্কেট আর পার্ক স্ট্রিট।
আমার জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ ছিলো এটি। জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে প্রথমবার পা রাখি বিদেশের মাটিতে। সাংবাদিকতার কাজে নয়, নিছক ভ্রমণের টানে, দেখার কৌতূহলে। আজও মনে পড়ে মানুষের টানা রিকশায় চেপে বসে রাইটার্স বিল্ডিং, রাজভবন, কলকাতা হাইকোর্ট, টাউন হল দেখার স্মৃতি। ডালহৌসি পাড়ার লাল ইটের দালানগুলো ছুঁয়ে দেখে মনে হয়েছিল ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে দেখছি। কলেজ স্ট্রিট। বইয়ের নগরী। ফুটপাত জুড়ে বইয়ের দোকান। কফি হাউজে বসে চা পান। সায়েন্স সিটি আর বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়াম বা তারা মন্ডল। গম্বুজের নিচে বসে মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্র দেখার অন্যরকম অনুভূতি ছিল। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতেও মানুষ কত এগিয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে কলকাতা এক প্রাণবন্ত নগরী। ভ্রমণকারীর চোখে এ শহর একটা খোলা জাদুঘর। প্রাসাদের নগরী কলকাতা, আধুনিক কলকাতার এই অপূর্ব ভ্রমণস্মৃতি আমার মননে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। #
*প্রথম ছবি: ইতিহাসের সামনে*
সেদিন দাঁড়িয়েছিলাম *এশিয়ার প্রাচীনতম জাদুঘর ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের* সামনে। ১৮১৪ সালের সাদা প্রাসাদ। ২০০ বছরের দেয়াল, খিলান আর গম্বুজ। হাত বাড়িয়ে মনে হচ্ছিল সময়কে ছুঁয়ে দিচ্ছি। আর কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে ইতিহাস দেখছি।
*দ্বিতীয় ছবি: বিজ্ঞানের সামনে*
সেদিন গিয়েছিলাম সায়েন্স সিটি, কলকাতা। পেছনের সেই বিশাল গম্বুজটা “স্পেস থিয়েটার”। ছোটবেলার কৌতূহল নিয়ে ঢুকেছিলাম। চোখে ছিল স্বপ্ন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নতুন কিছু জানার নেশা।
[আগামী পর্বে: দিগন্তে ভ্রমণের স্মৃতি – ০২ | বার্সেলোনার রঙ: গাউদি, অলিম্পিক ও বৈশাখী উৎসব]

