প্রচ্ছদ

“ভোটের আগে গ্যাস চাই-নইলে এবার ভোট নাই”

  |  ১৭:২৭, এপ্রিল ১৪, ২০২০
www.adarshabarta.com

আহমেদ ইকবাল চৌধুরী:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি আমাদের সিলেট, আর এ সিলেটকে নিয়ে সিলেট বাসীর স্বপ্নের অন্ত নেই । আমি ও তার ব্যতিক্রম নই। আল্লাহ তায়লার অশেষ মহিমায় মহিমান্বিত এই সিলেটে কি নেই। তেল, গ্যাস, চা, বৈদেশিক মুদ্রা, পর্যটন শিল্প, নান্দনিক শপিংমল, বড় বড় অট্রালিকা ইত্যাদি সবই আছে এই সিলেটে। নেই শুধু সুষ্ট পরিকল্পনা এবং নিজেদের আধিকার আদায়ে গনসচেতনতা। সিলেটিরা বিভাগ পেয়েছিল অনেক আন্দোলন করে। নব্বই এর দশেকে সিলেট বিভাগ আন্দোলনে সিলেট গণদাবি পরিষদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে সিলেটবাসী তাদের নায্য দাবী আদায় করে নিয়েছিল। তার পরে বাংলাদেশে আরও অনেক বিভাগ হয়েছে, কিন্তু তাদের এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। সিলেটিরা দিতে সবার আগে – কিছু পেতে সবার পিছে।

সিলেটিরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। গ্যাস, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্তা সর্ব ক্ষেত্রে সিলেটিরা পিছিয়ে। সিলেটের গ্যাস নিয়ে বাংলাদেশের অন্যান্য অন্চলে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে অথচ সিলেটবাসী সেই আদিম পদ্বতিতে রান্নার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ২৫ বৎসর আগে কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে যখন বড় বড় পাইপ দিয়ে সিলেটের গ্যাস অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তখন সিলেটিদের বলা হয়েছিল যে পর্যায়ক্রমে সিলেটের সর্বত্র গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। এক এলাকার সম্পদ অন্য এলাকার উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে এতে কারও আপত্তি নাই, কিন্তুু যে মানুষটি তার একমাত্র অবলম্বন একখন্ড জমি তা দিয়ে দিল দেশের জন্য, যার বাড়ীর মধ্যখান দিয়ে বড় গর্ত করে, ফসল নষ্ট করে গ্যাস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অথচ তাকে একবেলা রান্না করার জন্য টোকাই এর মত লাকড়ী কুড়াতে হচ্ছে- তার জন্য কি একটু করুনা হয়না ? গ্যাস সংযোগ পাওয়া এখন আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কি। বাংলাদেশ সরকার বাসা বাড়ীতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। কোন দেশে যখন জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকে , জনগণের ভোটে যখন সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, সেই সরকার কেবলই যে কোন সিদ্বান্ত নেবার আগে দেশের জনগণের অধিকার ও সুযোগ সুবিধাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকারের এ সিদ্ধান্তে কত % লোক উপকৃত হবে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমার জানা নেই, তবে এতটুকু বলতে পারি যে, গুটি কয়েক শিল্পদ্যোক্তার জন্য বৃহৎ জনগোষ্টীকে সুবিধা বন্চিত করা কতটা যুক্তিযুক্ত তা বিচারের ভার জনগণের উপর ছেড়ে দিলাম। বিদ্যু প্রতিমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন যে যাদের গ্যাস সংযোগ রয়েছে তাদের গ্যাস সংযোগ ও বন্ধ করে দেওয়া হবে। বাংগালীরা ইংরেজ ও পাকিস্তানীদের পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে আসলে ও নিজ দেশীয় নব্য রাজাদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। কল-কারখানায় নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রত্যেক বাংলাদেশীর প্রাণের আকুতি কারন বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির মুল চালিকাশক্তি। কিন্ত সাধারন জনগনকে বন্চিত করে একটি গোষ্টীর স্বার্থ রক্ষা কোন জনকল্যাণকর সরকারের কাজ নয় এবং সেই সরকারকে জনগনের সরকার বলা যায় না।

সরকার চাইলে শিল্পের জন্য আলাদা গ্যাস আমদানী করে প্রয়োজনে ভুর্তুকী দিয়ে রুগ্ন শিল্প কারখানা বাচিয়ে রাখতে পারে। আর আমাদের দেশে অনেক শিল্পপতি রয়েছেন যারা নিজ উদ্দোগে গ্যাস আমদানী বা গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন। সরকার শুধু আমলাতানত্রিক জঠিলতা দুর করে ব্যবসায়ীদেরকে আস্থার ও ব্যবসা বান্দব পরিবেশ সৃষ্টি করলে শিল্পের জন্য গ্যাস আমদানীতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার অভাব হবে না। কারন পুরো বিনিয়োগটাই ব্যাবসায়ীরা তাদের client দের থেকে পুষিয়ে নিতে পারেন, কিন্ত একজন সাধারন মানুষ কে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে যে জটিলতা, হয়রানি, মজুতদারী ও লাগামহীন মুল্য বৃদ্ধি করে সংকট সৃষ্টি সহ নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তার প্রতিকার পাওয়ার বা ক্ষতি পুষিয়ে নেবার কোন জায়গা নেই। পুঁজিবাদী ব্যবস্তা আমাদের সমাজে রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করেছে। আসলে সব কিছুর মুলে রয়েছে উচ্ছবিত্তের স্বার্থ সংরক্ষন।

গ্যাস আমাদের জাতীয় সম্পদ, আর এ সম্পদ রক্ষনাবেক্ষনের জন্য সরকারের যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি সাধারন জনগনের ও অনেক দয়িত্ব রয়েছে। গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। গ্যাসের মুল্য মিটার দিয়ে নির্ধারণ করা হয় না বিধায় ২৪ ঘন্টা চুলায় আগুন জ্বালানো থাকবে, একটি প্রবাদ আছে “সরকারী মাল, দরিয়া ম্যায় ঢাল” এ ধরনের মনোবৃত্তি আমাদের সমাজে কাজ করে, তা পরিহার করে সরকার ও জনগনকে একসাথে কাজ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে:-

যে জন দিবসে মনের হরষে

জ্বালায় মোমের বাতি

আশুগৃহে তার, দেখিবেনা আর

নিশীতে প্রদীপ বাতি।

সরকার প্রয়োজনে বিদুৎ এর মত মিটার লাগিয়ে গ্যাসের সদ্ব্বব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। কিন্ত কোন অবস্থাতেই গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।

বিলেতে বিশিষ্ট সাংবাদিক ইশহাক কাজলের একটি TV interview দেখেছিলাম , তখন থেকে লিখব লিখব ভেবে আর লিখা হয়নি। জনাব কাজলের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মত পার্থক্য থাকলেও তার সিলেটী জাতীয়তাবাদ এবং সিলেটকে নিয়ে তার ভাবনা দেখে সত্যিই অভিভুত হলাম। তিনি সিলেটবাসীকে নিজেদের দাবী দাওয়ার ব্যাপারে সচেতন, ও সোচ্চার হওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন এবং এ আন্দোলনে সকল প্রবাসীদের অগ্রনায়কের ভুমিকা পালন করার আহবান জানিয়েছিলেন। প্রবাসীরা তাদের সারা জীবনের কষ্ঠার্জিত সণ্চিত অর্থ দিয়ে তৈরী স্বপ্নের বাড়ী আজ দুংস্বপ্নের কারন হয়ে দাডি্য়েছে। দল মত নির্বিশেষে সিলেটবাসীকে নিজেদের অধিকার আদায়ে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। সরকার পরিচালনায় সিলেটী নেতা- নেত্রীর অংশীদারিত্তের কখনও অভাব ছিল না, এখনও নেই। সিলেটের জন্য আরও একজন সাইফুর রাহমানের বড় প্রয়োজন, যিনি সিলেটবাসীর মনের ভাষা বুঝতে পারেন, যার স্পর্শে ঐতিহ্যবাহি সিলেট হবে আলোকিত।

সিলেটবাসী আধুনিক সিলেটর রুপকার, বিশ্ব নন্দিত সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম জনাব সাইফুর রাহমান, সাবেক স্পিকার মরহুম জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ ও সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী মরহুম জনাব আব্দুস সামাদ আজাদের বড়ই শুন্যতা অনুভব করছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত সিলেটের সুযোগ্য সন্তান , তাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। আশা করব তিনি সিলেটের এই বড় বড় দালান গুলোর দিকে সুহ্রদ দৃষ্টি দিবেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সিলেট তথা গোটা বাংলাদেশের গ্যাস সমস্যার সমাধান করবেন। নইলে সময়ের বিবর্তনে মানুষ তার নায্য পাওনা আদায়ে কঠিন সিদ্বান্ত নিতে বাধ্য, যা সিলেটের আকাশ বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। সিলেটবাসী বলতে শিখেছে “ভোটের আগে গ্যাস চাই, নইলে এবার ভোট নাই”।

লেখক: ব্যাংকার, লন্ডন প্রবাসী