প্রচ্ছদ

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী: শিক্ষা ও জনসেবার এক আলোকবর্তিকা

  |  20:09, July 04, 2026
www.adarshabarta.com

Manual2 Ad Code

সাদেকুল আমীন:

বিশিষ্ট আলেম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর ইন্তেকালে সিলেট অঞ্চলের ধর্মীয়, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ১৩ই জুন ২০২৬, শনিবার সিলেট শহরের ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে শিক্ষা, সমাজসেবা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জনকল্যাণকে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ ও কর্মময় জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনী নয়, বরং এক সমৃদ্ধ সামাজিক ও নৈতিক লেগ্যাসি যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার ৯নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী তালবাড়ী গ্রামের (চৌধুরী বাড়ী) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাঁর পিতা মাওলানা আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন একজন সম্মানিত আলেম। শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করেন। কোরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তিনি নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার শিক্ষা গ্রহণ করেন, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল বিস্তৃত এবং সমাজকল্যাণমূলক।

তিনি জীবনের প্রথম থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি জাতির উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা ও নৈতিকতা। এই বোধ থেকে তিনি শিক্ষা বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কেবল ধর্মীয় জ্ঞান নয়, আধুনিক শিক্ষার সাথে নৈতিকতার সমন্বয়ই একটি আদর্শ সমাজ গড়তে পারে। এই চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর মধ্যে একটি হলো কানাইঘাটে তাঁর নিজ গ্রাম তালবাড়ীতে জামেয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া ফাজিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। এছাড়াও তিনি সিলেটের মিরাবাজার জামেয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আল-আমিন জামেয়া স্কুল এবং পাঠানটুলা কামিল মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজারো শিক্ষার্থী শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছে এবং সমাজে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে।

শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি তিনি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৃত মানুষ কেবল নিজের জন্য নয়, বরং সমাজের সকল মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগে অংশ নেন এবং দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাঁর মানবিক আচরণ, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে।

রাজনৈতিক জীবনে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদে এই অঞ্চলের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে তিনিই কানাইঘাট উপজেলা থেকে একমাত্র সংসদ সদস্য যিনি সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের প্রতিনিধিত্ব করে পূর্ণ মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিনি এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সর্বদা সর্বসাধারণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন এবং তাঁদের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট থাকতেন। বিশেষ করে, তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সিলেট-কানাইঘাট রুটের গাজী বোরহান উদ্দিন সড়কটি কাঁচা থেকে পাকা সড়কে রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সিলেট ও কানাইঘাটের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়, যা এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটায়।এই ঐতিহাসিক অর্জনটি তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

Manual1 Ad Code

তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। জেলা আমির এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে তিনি সংগঠনের নীতি নির্ধারণ ও দিকনির্দেশনামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে তিনি সংগঠনের আদর্শ, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন।

তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি ছিল সততা, ন্যায়বোধ এবং আদর্শিক অঙ্গীকার। তিনি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেননি, বরং জনগণের কল্যাণকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে একজন নীতিবান, বিনয়ী এবং দূরদর্শী নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করতেন।

Manual6 Ad Code

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং চরিত্র গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু পাঠদানের কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলার চেষ্টা করেন।

জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন। ক্যান্সার, কিডনি রোগ এবং স্ট্রোকজনিত জটিলতা তাঁর জীবনকে কঠিন করে তোলে। তবে এই কঠিন সময়েও তিনি ধৈর্য, বিশ্বাস এবং মানসিক দৃঢ়তা বজায় রাখেন। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় আমাদের শেখায় যে একজন প্রকৃত মানুষ কষ্টের মধ্যেও তার আদর্শ ও বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয় না।

তাঁর মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তির প্রস্থান নয়, বরং একটি যুগের সমাপ্তি। তাঁর ইন্তেকালের পর পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষার্থী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর জীবনের কাজ ও অবদান তাঁকে মানুষের হৃদয়ে অমর করে রেখেছে। ইন্তেকালের পর তাঁর কয়েকজন নিকটাত্মীয় বলেন যে, তালবাড়ী চৌধুরী পরিবারে চারজন ‘স্টার’ বা নক্ষত্র ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মরহুম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী অন্যতম। অন্য তিনজন হলেন মরহুম ডা. লোকমান উদ্দিন চৌধুরী, ডা. নুরুল আম্বিয়া চৌধুরী এবং ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম চৌধুরী।

আজ মরহুম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর সেবামূলক কর্মকাণ্ড আজও জীবন্ত। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের সাফল্য ধন-সম্পদ বা ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যেই নিহিত।

তাঁর জীবন ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত – যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব এক সুতোয় গাঁথা ছিল। তিনি তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মানবকল্যাণে উৎসর্গ করে গেছেন।

Manual4 Ad Code

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শিক্ষা ও জনসেবায় তাঁর অনন্য অবদান যুগ যুগ ধরে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

মরহুম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর নামাজে জানাজা কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের তালবাড়ী গ্রামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামেয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া ফাজিল মাদ্রাসার মসজিদ ও সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে মাদ্রাসা মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

পরিশেষে, আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি। মহান আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তাঁর সকল নেক আমল কবুল করেন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও অনুসারীদের ধৈর্য ও শক্তি দান করেন। আমিন।

 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

Manual2 Ad Code

লন্ডন, ৩ জুলাই ২০২৬

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code