স্মৃতির মণিকোঠায় চিরভাস্বর মরহুম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী
মাহফুজুর রহমান:
২০০৬ সালের চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ তখন শেষপ্রান্তে। নতুন জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান কে. এম. হাসানকে নিয়ে আপত্তি জানিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিচ্ছিল এবং বিভিন্ন কর্মসূচি ও আন্দোলনের ডাক দিচ্ছিল। কিন্তু এসবের মাঝেও চারদলীয় জোটের নির্বাচনী কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো কানাইঘাট-জকিগঞ্জেও পুরোদমে চলছিল।
সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে চারদলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী ছিলেন এ জনপদের জননন্দিত নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সাহেব (রাহিমাহুল্লাহ)। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজার, গ্রামগঞ্জ ও জনবহুল এলাকাগুলোতে নিয়মিত পথসভা ও জনসভার আয়োজন করা হতো।
তখন আমার বয়স মাত্র পনেরো বছর। বিভিন্ন নির্বাচনী সভা-সমাবেশে আমাকে ইসলামী সংগীত ও নির্বাচনী গান পরিবেশনের জন্য ডাকা হতো। কিশোর বয়সের সেই সময়টি ছিল আমার সংগীত জীবনের অন্যতম এক ব্যস্ত সময়। সেই উত্তাল দিনগুলোর একটি বিশেষ ঘটনা আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
সেদিন কানাইঘাটের মানিকগঞ্জ বাজারে এক বিশাল নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী এমপি সাহেব। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করছিলেন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক এহসানুল হক জসীম ভাই। যথারীতি তিনি আমাকে মঞ্চে ডেকে একটি নির্বাচনী গান পরিবেশনের অনুরোধ করলেন।
আমি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে গান শুরু করলাম—
সব মানুষের মন কাড়িতে তোমার কী বাহানা,
তাসবীহ হাতে পট্টি মাথায় তোমার কি ছলনা,
বুবু গো, ও তুমি কেমন নৌকার মাঝি,
এখন তোমার নৌকা চলে না…”
গানের মুখটি মাত্র শেষ করেছি, সম্পূর্ণ শেষ করতে পারিনি। হঠাৎ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সাহেব কিছুটা মৃদু আপত্তি ও বিরক্তি প্রকাশ করে আমাকে গানটি বন্ধ করতে বললেন। তাঁর নির্দেশ পেয়ে আমি গান বন্ধ করে সোজা স্টেজ থেকে নেমে গেলাম।
সেদিন হয়তো আমি বয়সে খুব ছোট ছিলাম, কিন্তু জীবনের শ্রেষ্ঠ এবং অন্যতম বড় একটি শিক্ষা পেয়েছিলাম সেই মুহূর্তেই।
আমি উপলব্ধি করতে পারলাম, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সাহেবের মতো একজন রুচিশীল, মার্জিত, সুন্নাহর অনুসারী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জননেতা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে কোনো রূপ বিদ্রূপ, কটাক্ষ বা ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য পছন্দ করতেন না। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন—আদর্শের লড়াই আদর্শ দিয়েই হতে হবে; ব্যক্তিগত আক্রমণ, উপহাস কিংবা প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে নয়।
রাজনীতির ময়দানে তিনি ছিলেন যেমন দৃঢ়চেতা, আপসহীন ও স্পষ্টভাষী; ঠিক তেমনি ব্যক্তিগত আচরণে ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, সৌজন্যপরায়ণ এবং অসাধারণ রুচিবোধের অধিকারী। প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম সম্মানবোধ ধরে রাখাও যে একজন আদর্শ নেতার চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য হতে পারে, সেই বাস্তব শিক্ষা আমি সেদিন তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।
আমার পনেরো বছর বয়সের সেই কিশোর মন সেদিন বুঝে নিয়েছিল—মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সাহেব শুধু একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ এবং উচ্চমাপের একজন আলেমে দ্বীন। তাঁর নেতৃত্বের যেমন মোহনীয় শক্তি ছিল, তেমনি ছিল চরিত্রের ঔজ্জ্বল্য, ব্যক্তিত্বের গভীরতা এবং ইসলামী মূল্যবোধের এক সুদৃঢ় ভিত্তি।
সেদিনের পর থেকে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বহুগুণ বেড়ে যায়। আমি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হই, কেন এই অঞ্চলের মানুষ তাঁকে এত ভালোবাসত, কেন তাঁকে এত সম্মান করত, এবং কেন তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক অবিচল আস্থা ও ভালোবাসার স্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের পর স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে বারবার সেই দিনের ঘটনাটি মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, এমন রুচিশীল, নিবেদিতপ্রাণ, জনদরদী, পরোপকারী, আমানতদার এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতার বড়ই অভাব আজ আমাদের সমাজে। কানাইঘাট-জকিগঞ্জের মাটি আবার কবে এমন একজন রাহবার ও মুখলিস মানুষ উপহার দেবে, তা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই ভালো জানেন।
হে আল্লাহ! আপনার এই মুখলিস বান্দা, আমাদের প্রিয় নেতা এবং এই জনপদের প্রিয় অভিভাবক মরহুম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সাহেবকে ক্ষমা করে দিন। তাঁর জীবনের সকল নেক আমল কবুল করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করুন। তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের এই শোক কাটিয়ে ওঠার তাওফিক দান করুন। আমীন!
মাহফুজুর রহমান – লন্ডন প্রবাসী লেখক ও কালচারাল এক্টিভিস্ট

