হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচন ও কিছু ভাবনা
আবু সালেহ ইয়াহইয়া
এক.
Hungary এর জাতীয় ইলেকশনে ১৬ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকা Viktor Orban পরাজিত হয়েছেন। Opposition leader Peter Magyar এর দল দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। Peter ছিলেন হাঙ্গেরির রাজনীতিতে প্রায় অপরিচিত এক মুখ। তরুন এই রাজনীতিবিদ মাত্র দুই বছর আগে থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে পুরাই বাজিমাত করেছেন।
হাঙ্গেরির মানুষের রাজনৈতিক চিন্তার এই পরিবর্তন আঁচ করতে পেরে ট্রাম্প সরাসরি Viktor Orban এর পক্ষাবলম্বন করেন। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স নজিরবিহীনভাবে নিজে হাঙ্গেরি সফর করে Orban এর পক্ষে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়নি। লেন্ডস্লাইড বিজয় হয়েছে Peter এর দলের।
ইরান ইস্যুতে ইউরোপের সাথে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যেই ইউরোপ যেন আমেরিকাকে আরেকটা বড় পরাজয় উপহার হিসেবে দিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামনের দিনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাতীয় নির্বাচনেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা বেশি। অর্থাৎ যারাই আমেরিকা ও ট্রাম্প -এর সমর্থন পাবে, নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হওয়ার আশংকা থাকবে। কারণ বাতাস এখন উল্টো বইতে শুরু করেছে।
এদিকে কানাডাও বলেছে, তারা তাদের ডিফেন্স এর জন্য যা করার তা নিজেরাই প্রডিউস করবে। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করবে। এ জন্য আমেরিকার উপরে তারা আর নির্ভর করবে না। এটাও ট্রাম্প ও আমেরিকার প্রতি তাদেরই প্রতিবেশী আরেকটি দেশের একটা চপেটাঘাত।
কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের মেয়র ইলেকশনেও ট্রাম্প সরাসরি জোহরান মামদানির বিরোধীতা করেছিলেন। তার প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু দিনশেষে জোহরান বিজয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
দুই.
হরমুজ প্রণালী অপেন করতে গিয়ে হরমুজ প্রণালীর বাইরে ব্লকেড দিয়েছে আমেরিকা। ব্লকেড দিয়ে ব্লকেড অপেন করার চেষ্টা এই প্রথম দেখলো বিশ্ব। এতে মোটাদাগে চীন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করা হলেও বিকল্প পথে চীন তার কাজ সেরে নিতে পারবে। তবে এই ব্লকেডে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ট্রাম্প হয়তো মনে করছে এর ফলে ইউরোপের বড় দেশগুলো তার সাথে যোগ দেবে। কিন্তু উল্টো ফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ইউরোপের জনগণ দেখছে ইরান নয় বরং আমেরিকার কারণেই তাদের শিপগুলো তেল বহন করতে পারছেনা। সন্দেহ নেই, সংকটের কারণে তেলের দাম বাড়বে। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়বে। সাধারণ জনগণের পকেটকে সরাসরি টাচ করবে আমেরিকার এই ব্লকেড। ইউরোপে ট্রাম্প আরও অজনপ্রিয় হবে। তার নীতির সাথে একমত থাকা দলগুলোর রাজনীতির ভবিষ্যত আকাশে আরও বেশি ধোঁয়াশা পরিলক্ষিত হবে।
তিন.
আমাদের দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এখন আবার নতুন করে ভাবতে হবে। তাদের ফরেন পলিসি রিভিউ করারও সময় এসেছে। এই দেশগুলোর রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ আমেরিকার কারও সাথে দেখা করতে পারলে নিজের এক পা আসমানে উঠে গেছে বলে মনে করেন। তাদেরকে খুশি করতে বিভিন্ন পলিসি নিয়ে থাকেন। এমনকি নিজের আদর্শ ও জনগণের মতের বিরুদ্ধে গেলেও। সময় এসেছে নিজের পলিসিতে স্ট্রীক্ট থাকার। যে কোন ইস্যুই হোক। যা জনগণের ও নিজ আদর্শের পক্ষে যায় তার সাথে কোন কম্প্রোমাইজ নয়। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও এর নেতাদের যে কী মনে করেন, সাম্প্রতিক সৌদির এম-বি-এসকে নিয়ে তার অপেন মন্তব্যই প্রমাণ দিয়ে দিয়েছে। এরপরেও আরব নেতাদের হুশ ফিরবে কি? তারা কি তাদের ফরেন পলিসি রিভিউ করবে?
চার.
কিছু বিষয়ে আমরা মুসলিম দেশের নেতারা মিন মিন করি। ভাবি, পশ্চিমের নেতারা কি মনে করবে। অথচ এসব বিষয়ে এরা নিজেরাই ধীরে ধীরে সৃষ্টিগত ন্যাচারাল দিকেই ফিরছে। কিছু দিন আগে ট্রাম্প কংগ্রেসে এক অফিসিয়াল পলিসি পেপারে সাইন করার পর বলেন -There are only two genders. Male and female. এর দ্বারা তিনি কি মিন করেছেন তা সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু আমরা এদের সামনে এই প্রশ্নের উত্তরে এ বিষয়টা এভাবে বোল্ড করে বলতে পারিনা। হীনমন্যতায় ভোগি।
এদিকে ইউকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রিশি সোনাকও সাংবাদিকদের সাথে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন – A man is a man and and a woman is a woman. That’s just common sense.
অথচ দেখুন, অনেক মুসলিম দেশ জোর করে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু ইম্পোজ করছে। যত্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখাচ্ছে। ফান্ডিং করে এদের রাজপথেও নামাচ্ছে। প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে। অথচ পশ্চিমের দেশের জনগণ আর রাজনীতিবিদরাই রিলেশনশীপের এর ক্ষেত্রে অপেনলি এ বিষয়কে উড়িয়ে দিচ্ছে।
পশ্চিমের নেতারা বা কূটনৈতিকরা যখন আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে দেখা করে এইসব বিষয়ে আমাদের পলিসি জানতে চায়, তখন আমরা কি এগুলো পশ্চিমের নেতাদের মতই বোল্ডভাবে বলে দিতে পারি? পারলে ভাল। তবে আমার নজরে আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে মিন মিন করে- “এগুলো ইসলামের বা আমাদের কালচারের সাথে যায় না-” এমন কথা বলতে শুনেছি। এই বক্তব্য সঠিক হলেও এমন উত্তরকে এরা মৌলবাদী বলে ট্যাগ দেয় এবং এতে তারা খুশি হয়না। কাজেই এর বাইরে, এগুলো যে ন্যাচারেরই বিপরীত এবং পশ্চিমের দেশের জনগণ ও রাজনীতিবিদরাও যে এগুলো আর বিশ্বাস করছেনা এই দিকটাও বোল্ডভাবে হাইলাইট করতে হবে। অর্থাৎ তাদের বক্তব্য দিয়েই তাদের এক্সপোর্ট করা পলিসি খন্ডন করা জরুরি।
পাঁচ.
দুনিয়ার রাজনীতি দিন দিন ডানপন্থার দিকেই আগাচ্ছে। সবাই নিজের বিশ্বাস ও আদর্শ ও ভ্যালুকে সামনে আনছে। কোন রাখডাক ছাড়াই। অতএব, নিজেদের আদর্শ, মৌলিক পলিসি ও প্রিন্সিপলের সাথে কোন কোম্প্রমাইজ না করে জনগণের পালস অনুযায়ীই সামনের দিনের রাজনীতির গতিপথ ঠিক করা জরুরি। আর তিন বেলার বদলে দুই বেলা কিংবা দুই বেলার বদলে এক বেলা খেয়ে হলেও নিজেদের ডিফেন্স বা নিরাপত্তার জন্য যা করার তা করা জরুরি। কানাডার রিসেন্ট স্ট্রাটেজিক মোভ থেকে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নেয়া উচিত। নিজদের খাই খাই স্বভাব বাদ দিয়ে কোন পলিসি বা স্ট্রাটেজির বলে একসাথে বিশ্বের দুই পরাশক্তির সাথে এত দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের প্রতিরোধ করতে পারার ঘটনা এবং ইউরোপের দেশে দেশে আমেরিকার আধিপত্য হ্রাস হওয়ার কারণ পর্যবেক্ষণ করে আমাদের দেশনেতারা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত স্ট্রাটেজিক পলিসি ঠিক করবেন কি?
লেখক: লন্ডন প্রবাসী, প্রাক্তন ছাত্র নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত।

