প্রচ্ছদ

করোনা মোকাবিলায় চাই সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা

  |  10:24, April 30, 2020
www.adarshabarta.com

Manual7 Ad Code

:: অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান ::

Manual1 Ad Code

যেকোনো সমস্যার সমাধান ও মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেকে না বুঝে গুরুতর বিষয়ে নানা কথাই প্রায়ই বলে থাকি। বর্তমানে চলমান করোনাভাইরাসে সৃষ্ট মহামারি, মহামারি নিয়ন্ত্রণ এবং তা কতদিন অব্যাহত থাকবে, এসব বিষয়ে কেবল এক্সপার্টরাই বলতে পারবেন। তবে আমি নিশ্চিত যে, খুব তাড়াতাড়ি কিংবা সহসাই এই কোভিড-১৯ সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ কোভিড-১৯ এর টিকা আবিষ্কারের প্রচেষ্টা চলছে। তবে তা বাজারে আসতে অনেক সময় লেগে যাবে। কাজেই এই সময়টুকু আমাদেরকে কোভিড-১৯ এর সাথেই থাকতে হবে। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কমবে-বাড়বে, মৃত্যুহারও কমবেশি হবে এ রকম অবস্থা চলতেই থাকবে।
২.

আমি ব্যবস্থাপনার শিক্ষার্থী হিসেবে করোনাভাইরাসের সৃষ্ট পরিস্থিতির ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি জোর দিতে চাই। করোনাভাইরাস মোকাবিলা নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকারের বিভিন্ন মহল এবং প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের নিকট থেকে শুরুতেই বিভিন্ন মতামত, বক্তব্য এবং মন্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই তা মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই শুনেছি। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, কোভিড-১৯ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং বাস্তবতার মাঝে ব্যাপক ব্যবধান। অর্থাৎ প্রস্তুতির সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে প্রস্তুতির কোনো শেষ নেই। আমাদের চেয়ে শতগুণ ভালো ব্যবস্থাপনার দেশ ইউরোপ-আমেরিকা। তারাও বলছে যে, তাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে। করোনা প্রতিরোধে আমাদের যেসব সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে, আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোরও একই ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক লোক করোনা প্রতিরোধ নিয়ে বেশি কিছু আশা করেছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং প্রশাসন ব্যাপক কিছু করে ফেলবে। কিন্তু সে রকম কিছু আশা করা মোটেই উচিত হয়নি। করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশেও সময় যথেষ্ট ছিল না। করোনা প্রতিরোধে মাত্র এক-দুই মাসের মধ্যে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার খুব বেশি উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশে গত ৫০ বছর ধরে স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর। মোট জিডিপির এক শতাংশের কম স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ হয়েছে।

Manual3 Ad Code

বর্তমানে চলমান কোভিড-১৯ পুরোটাই অপরিচিত সংক্রামক রোগ। এটি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি, সুরক্ষা সামগ্রী এবং সরকারের টেকনিক্যাল ব্যবস্থার যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। করোনার সর্বশেষ পর্যায়ে এসে শ্বাসকষ্ট হয়। এর জন্য প্রয়োজন ভেন্টিলেটর। কিন্তু বাংলাদেশে পুরো জাতির জন্য রয়েছে মোট দুই হাজার ভেন্টিলেটর। এর মধ্যে ১৫০০ ভেন্টিলেটর গত আট-দশ বছরে তৈরি করা হয়েছে। এর আগে গত ৪০ বছরে বিগত সরকার, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রশাসন এত ভেন্টিলেটর তৈরি করেনি। অর্থাৎ গত ৪০ বছরে আমাদের মোট ভেন্টিলেটরের সংখ্যা ছিল ৫০০। কাজেই করোনার আবির্ভাবের পর গত কয়েক দিনে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অনেক কিছুই করা সম্ভব, এমন ভাবনা অকল্পনীয়। কাজেই সরকার কম চেষ্টা করেছে কিংবা আগে থেকে করলে আরও ভালো হত- এসব আবেগী কথা। অনেকে না বুঝেই কথাগুলো ব্যক্ত করছেন।

৩.

বর্তমানে করোনাভাইরাস পরীক্ষা কেন্দ্রের বিস্তার হয়েছে। আগে মাত্র একটি কেন্দ্রে পরীক্ষা করা হতো। এখন পর্যন্ত ২৫টির মতো কেন্দ্রে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ নেই। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে অবস্থা, তাতে যদি ইউরোপ আমেরিকার মতো ব্যাপক সংক্রমণ হয়, তাহলে দ্রুত তো নয়ই, অনেক সময় নিয়েও মোকাবিলা করতে পারব না। হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন এবং লকডাউন শব্দগুলো পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এসেছে। সেখানে এসব বিষয় যত সহজে করা যায়, বাংলাদেশে বিষয়গুলো ভাবা অসম্ভব। কারণ আমাদের বাসাবাড়ির যে অবস্থা, সেখানে হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন এবং লকডাউনের বিষয়গুলো সম্ভব নয়। বিশেষ করে পুরান ঢাকার বাসাবাড়ির যা অবস্থা, সেখানে লোকজন এমনিতেই বাড়ির বাইরে থাকে। রাতের বেলা কেবল বাসায় ঘুমাতে যায়। বস্তিগুলোতে ঘরে থাকার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই।

এসব দিক বিবেচনায় করোনা মোকাবিলা বাংলাদেশে জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ। ইতোমধ্যে সে শিক্ষা আমরা পেয়েছি। দেশের মোবাইল কোম্পানি বিগ ডাটা বিশ্লেষণ থেকে তারা একটি হিসাব দিয়েছে, আমাদের দেশে ঘরে থাকার বিষয়টি ৭০ থেকে ৮২ শতাংশ পর্যন্ত সফল। যা শহরের হিসাব। তবে গ্রামে এখনও ব্যাপকভাবে করোনার বিস্তার ঘটেনি। কাজেই আমাদের বেঁচে থাকতে হলে ঘলে থাকা, সামাজিক দূরত্ব, স্যানিটাইজার এসব বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভর হওয়ার সুযোগ খুব বেশি নেই। করোনা প্রতিরোধে আমরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি, তা দিয়ে আমরা কতদূর পর্যন্ত যেতে পারতাম? এত অল্প সময়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। যেসব হাসপাতাল করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোও মাত্র কয়েক বছর আগে তৈরি করা হয়েছে। মুগদা হাসপাতাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল এগুলো ৮/১০ বছর আগে নির্মিত। কাজেই এখন রাজনীতি করার সময় নয়। আমরা যতই প্রস্তুতি গ্রহণ করি না কেন, ইউরোপ আমেরিকার মতো হতে পারব না। হোয়াইট হাউজের সামনে গিয়েও নার্সরা পিপিইর জন্য আন্দোলন করেছে। এগুলো গণমাধ্যমে এসেছে। কাজেই করোনা প্রতিরোধে প্রস্তুতির কোনো শেষ নেই। করোনায় আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হবো- এমন বিশ্বাসে আশ্বস্ত হওয়া যাবে না। এখন আমাদের উচিত হবে মহামারি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ নেয়া।

Manual6 Ad Code

৪.

রাজনীতিবিদরা বলেছিলেন, করোনা মোকাবিলায় আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক কারণে জনগণকে আশ্বস্ত করতে চান। আমাদেরকে তাদের কথায় আশ্বস্ত হলে চলবে না। যারা রাজনীতিবিদদের কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন আমি তাদেরকে বোকা মনে করি। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব পড়বে। তবে জীবন আগে বাঁচাতে হবে।

করোনা মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদেরকে কিছু শিল্পকারখানা স্বল্প পরিসরে চালু করতে হবে। দেশের পোশাকশিল্পের কয়েকটা ক্যাটাগরি আছে। বিশ্বমানের কতকগুলো কারখানা রয়েছে। শ্রমিকরা যদি কারখানায় না থাকে, তাহলে থাকবে কোথায়? তারা থাকবে বস্তিতে, খুপরি ঘরে। সেখানে সামাজিক দূরত্বের কোনো ব্যবস্থাই নেই। কাজেই তারা যদি কারখানায় শিফটভিত্তিক কাজ করে এবং সেখানে স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে মাস্ক পরাসহ অন্যান্য সুবিধা থাকে, তাহলে কারখানা খুলে দিতে সমস্যা নেই। করোনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা। শারীরিক সক্ষমতার জন্য পুষ্টি দরকার। আমি জানি, ৩০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিককে দিনে নাস্তা হিসেবে একটি করে ডিম এবং কলা দেয়া হয়। শ্রমিকরা যে আট ঘণ্টা ডিউটি করবে, অন্তত সে সময় ভালো জায়গায় থাকবে। সে কারখানায় না আসলে বস্তিতে খুপরি ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকত। করোনা পরিস্থিতি আমাদের জন্য নতুন। এর জন্য কেউ তৈরি ছিল না। কাজেই কী ধরনের সমস্যা হবে, সেটাও আমরা জানি না। কিছু কিছু মালিক শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থাও করতে পারেন। ঘিঞ্জি ঘরের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা থাকার চেয়ে কারখানায় কাজ করা উত্তম।

এদিকে মুরগির খামার শেষ হয়ে যাচ্ছে। ডিম নষ্ট হচ্ছে। কৃষক কলার দাম পাচ্ছে না। কাজেই শ্রমিকরা কারখানায় এলে দৈনিক ২৫ লক্ষ ডিম এবং কলা বিক্রি হবে। কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে হবে। যা বাজার অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত। গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমার অত্যন্ত পছন্দের ব্যক্তিত্ব। আমি মনে করি কিট নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। আশা করছি দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। রক্ত দিয়ে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। রক্তের মাধ্যমে কোভিড-১৯ পরীক্ষা হলে ভালো হতো। ড. বিজন শীলের উচিত ছিল সংশ্লিষ্ট সবার কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা। তবে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে দ্রুত কোন সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। বরং তা মোকাবিলায় সঠিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অবশ্যক।

Manual3 Ad Code

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code