প্রচ্ছদ

ঈদুল ফিতর এবং আমাদের দায়িত্ববোধ

  |  ১২:১৫, এপ্রিল ২৯, ২০২২
www.adarshabarta.com

:: এবিএম সালেহ উদ্দীন ::

বারবার ফিরে আসা ফিতরা দানের ঈদ, দীন-দরিদ্রের দুঃখ মোচনের ঈদ, পবিত্র ঈদুল ফিতর সমাগত। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের এক ফালি নতুন চাঁদ উদয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর খুশির সাওগাত নিয়ে ফিরে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। মুসলমানদের দুটি ঈদের মধ্যে ঈদুল ফিতরই হচ্ছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঈদ উৎসব। পবিত্র রমজান মাসের সিয়ামের প্রকৃত শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে দীর্ঘ এক মাস কঠোর কৃচ্ছ্রের মাধ্যমে। একজন প্রকৃত রোজাদার কোরআনুল কারিমের নির্দেশনা অনুপাতে রোজাব্রত পালন করার মধ্য দিয়ে সেসব উন্নত বৈশিষ্ট্যসমূহকে তুলে ধরতে পারেন। একজন প্রকৃত রোজাদার পবিত্র রমজানের পুরো মাসটিতে আল্লাহর বিধানের সর্বোত্তম নিয়ম বাস্তবায়ন ঘটানোর মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।

রোজাদারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘তাকওয়া’ অর্থাৎ খোদাভীতি। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ভিতকে মজবুত ও সুদৃঢ় করার মধ্য দিয়ে যেমন খোদাভীতি অর্জন করা সহজতর হয়, তেমনি রোজাব্রত পালনের মাধ্যমে গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সবক ও শিক্ষা পাওয়া যায়। যাতে সমাজের দুঃখী ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটে। অন্তরে খুশি ও আনন্দতৃপ্তির ছোঁয়া আসে।
প্রকৃতার্থে রোজার নিয়মসমূহ মেনে সিয়ামের প্রকৃত শিক্ষায় পুরো এক মাসে পরবর্তী এগারো মাসের আগাম পুণ্যত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের পথ সম্প্রসারিত হয়। আল্লাহর নিকট থেকে বান্দার গোনাহ মাফ ও নাজাতের পথ সুগম হয়। একজন সাধারণ মানুষকে মানবতার শ্রেষ্ঠ মানুষরূপে প্রতিষ্ঠিত করার পথ সহজতর হয়।

রোজাদার একমাত্র মহান আল্লাহর ভয়ে সর্বাত্মকভাবে তাঁরই সমীপে নিজেকে সোপর্দ করেন। দুস্থ, অসহায়, দুঃখী মানুষের মাঝে সদকায়ে ফিতর এবং জাকাত প্রদান করেন। এ সময় মুসলমানগণ মানবীয় গুণের সর্বোত্তম কাজগুলো করার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মহান আল্লাহর করুণা ও প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশায় ঈদের আনন্দে সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করেন। আনন্দ উৎসব ও খুশির মাধ্যমে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির পথকে প্রসারিত করে তোলেন। এভাবেই মুসলমানদের ঈদুল ফিতর সফল ও সার্থক হয়ে ওঠে। ঈদকে সম্মিলিতভাবে উদ্্যাপনের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল পর্যায়ে মানুষের মাঝে সাম্য, মৈত্রী, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বমূলক মানবতাবোধ জাগ্রত হয়।

ঈদের খুশি ও আনন্দের জাগ্রত ধারাকে স্বাগত জানিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন :
‘সেই সে পরম শক্তিরে লয়ে আসিবার ছিল সাধ,
যে শক্তি লভি এল দুনিয়ার প্রথম ঈদের চাঁদ।’
ঈদুল ফিতরের প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে ধনী-গরিব, ফকির-মিসকিন তথা সর্বস্তরের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেন ঈদ আনন্দ উৎসব পালন করতে পারে। এ প্রসঙ্গে মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের চিরায়ত আহ্বান :
‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ।’
‘মানুষেরে দিতে তাহার ন্যায্য প্রাপ্য ও অধিকার
‘ইসলাম এসেছিল দুনিয়ায় যারা কোরবান তার।’

চিরন্তন এই গানের মর্মই হচ্ছে মানুষের তরে নিজের সম্পদকে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ঈদের প্রকৃত শিক্ষাকে কার্যকর করা।
ঈদের সময় এ গানটির সুর-ধ্বনি শুধু মুসলিম জনমনেই নয়, বাংলার সকল মানুষের হৃদয় ঝলসে ওঠে। নিজের অহংকার ও অহংবোধকে ঝেড়ে ফেলে দুস্থ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসাই হলো এর প্রকৃত শিক্ষা। সকল প্রকার ভেদাভেদ ভুলে মানুষের মাঝে লীন হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে আছে; তাকে উপলব্ধি করা। আমাদের আচার-আচরণ এবং সামাজিক নীতির মূলেই তো হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ ও মানুষের স্বার্থে এগিয়ে আসা।
আসলে সব মানুষের রক্তের রং এক। এ সত্যটি জানার পরও মানুষ ভুল করে বিপথগামী হয়ে ওঠে। আমাদের উচিত কাউকে অবজ্ঞা ও অবহেলা না করে একই রক্তধারার সর্বস্তরের মানুষকে সম্মান জানানো। মহানবী (সা.) এর নির্দেশনা মতে, ‘মানুষের প্রতি ইহসান ও সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে ঈমান সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। এতে মহামহিম আল্লাহ খুশি হন। ঈদের আনন্দধারায় স্রষ্টা মহীয়ানের সামনে আমাদের সম্মিলিতভাবে হাজির হওয়ার মধ্য দিয়ে মহাখুশির বাতাবরণ বয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :
‘প্রতিদিন আমি, হে জীবনস্বামী,
দাঁড়াব, তোমারি সম্মুখে।
করি জোড়কর, হে ভুবনেশ্বর,
দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।’
…সব বিদ্বেষ দূরে

যত দূরে আমরা থাকি না কেন, মানুষ থেকে যেন বিচ্ছিন্ন না হই। সকলে মিলে ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে ঈদ আসুক আনন্দ ও খুশির পয়গাম নিয়ে। মানুষের প্রতি ভালোবাসার হাত প্রসারিত করার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের হৃদয়ে যে আনন্দ ও তৃপ্তি আসে, সেই শিক্ষাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন :

‘খোদার সৃষ্ট মানুষেরে ভালোবাসিতে পারে না যারা
জানি না কেমন জনগণ নেতা হতে চায় হায় তারা।’

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেটি বর্তমান বিশ্বে নেই। সমগ্র বিশ্বের ভয়ংকর মহামারি করোনাভাইরাসের ছোবলে স্থবির ও অচল হয়ে গেছে। পৃথিবীর এমন একটি অঞ্চল ও রাষ্ট্র নেই, যেখানে মরণব্যাধি করোনাভাইরাস আঘাত করেনি। প্রতিটি দেশেই অদৃশ্য ভাইরাসের সংক্রমণে মানুষের মর্মান্তিক অকালমৃত্যু হচ্ছে অবলীলায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিধির কঠোর নিয়ম পালন করার ফলে এবং টিকা প্রদানের মাধ্যমে বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ অনেকটা কমে আসছে। কিন্তু ভারতসহ উপমহাদেশের রাষ্ট্রসমূহ এবং বিশ্বব্যাপী যুদ্ধংদেহী মানসিকতা কমেনি।

সবচেয়ে করুণতম অবস্থা হচ্ছে ভারতে। গত এক বছরের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ভারতে। দেশটির মৌলবাদী মোদি সরকারের উগ্রচণ্ডী মনোভাব এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী নীতি চাপিয়ে দেওয়া এবং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে দেশটিতে অধিক হারে মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটছে। ভারত বিশ্বের একটি জনবহুল দেশ। যার অধিকাংশ রাজ্য চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে। বিগত বছরসমূহে একই সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়েছে। রাষ্ট্রতান্ত্রিক উসকানিতে হিন্দু মৌলবাদ যেমন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তেমনি সংখ্যালঘুদের ওপর চলেছে পাশবিক অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের স্টিম রোলার। ধর্মীয় সংঘাত, সন্ত্রাস, কুসংস্কার ও অপরাধপ্রবণতা ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় গত বছরের করোনাভাইরাসের আক্রমণটি ছিল মড়ার উপর খাড়ার ঘা। মানবিক বিপর্যয়ের কঠিন অবস্থায় ছিল ভারত।

ভারতের রাষ্ট্রতান্ত্রিক অব্যবস্থাপনায় সরকারদলীয় হিন্দু মৌলবাদকে উসকে দিয়ে বিভিন্ন স্থানে মুসলিম নাগরিক জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। ধর্মীয় মৌলবাদের নিপীড়ন ও কোথাও কোথাও অবলীলায় চালানো হয়েছে পাশবিক অত্যাচার।
অন্যদিকে বিশ্বের অনেক দেশে আর্থসামাজিক করুণ অবস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রতান্ত্রিক নিপীড়নে জনজীবনে নাভিশ্বাস। সর্বত্র মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বত্রই মানবীয় অধিকার বিনষ্ট হয়। মানববিধ্বংসের উন্মাদনায় কেন যেন পৃথিবী বিষাদময় হয়ে ওঠে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অবস্থা আরও করুণ। আর্থসামাজিকতা ও আর্তমানবতার বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্ব আক্রান্ত হয়ে আছে। এমন একটি দেশ পাওয়া যাবে না, যেখানে সন্ত্রাস, নৃশংসতা ও পাশবিকতা নেই। সামাজিক পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং পাশবিকতায় বিপর্যস্ত সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের নিরীহ মানুষ।

পবিত্র রোজার মাসেও সাধারণ মানুষের প্রতি অত্যাচার, নির্যাতন, নির্মম-নৃশংস হত্যাযজ্ঞ আর রাষ্ট্রীয় বর্বরতার খবরে আমরা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠি।
পবিত্র রোজার মাস কিংবা ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখেও মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে মানববিধ্বংসী হামলা এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ থাকেনি। এরই মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় স্বৈরতান্ত্রিক আগ্রাসন ও বর্বরতায় করোনাপীড়িত বিশ্ব শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার আগ্রাসনে বিশ্ব হতবাক হলেও যুদ্ধ থামানোর এখনো কোনো কার্যকর ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়নি। একইভাবে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের অবস্থাও অনেকটা অস্বস্তিকর। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নমুখী দেশ হলেও সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্রান্তিকাল। তবু সুশীল রাজনীতির গণতান্ত্রিক পরিবেশহীন অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা চলমান দেখে অবশ্যই ভালো লাগে। কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য, বর্তমানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সর্বত্র সরকারি দলের লোকদের দৌরাত্ম্যে গোটা দেশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বত্র দলীয় লোকদের বেপরোয়া হস্তক্ষেপে জনমনে অনেক উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কা বিদ্যমান। সমগ্র দেশব্যাপী অসাধু ব্যবসায়ী, চোর-বাটপারের অবৈধ ব্যবসায়ীর দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির ফলে সাধারণ মানুষের নাগরিক জীবন বিপন্ন। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। সরকারিভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যসামগ্রী কেনার ক্ষমতাও নেই অনেকের। পবিত্র রমজানে সেটি আরও বেশি হতাশাব্যঞ্জক হয়ে উঠেছে। প্রশাসনিক দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাশবিক হত্যাকাণ্ড, দলীয় লোকদের দুর্নীতির ফলে সর্বত্র লুটেরাদের দাপট।

রোজার মাসেও জনজীবন কেটেছে অর্থনৈতিক উৎকণ্ঠা এবং ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে। উৎকণ্ঠার আরও কারণ, রোজার মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা। বাংলাদেশের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনবহুল দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারে পবিত্র রমজানের রোজাব্রত পালন করা হয়। এ অবস্থায় প্রচণ্ড দাবদাহ ও গরমের মধ্যে রোজা রাখা পরিবারবর্গকে তাদের সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। প্রাত্যহিক চাকরিবাকরি ও কাজকর্মের মধ্যে বেশির ভাগ পরিবারের সন্তানের মাকে তাদের সন্তানকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। শহরের তীব্র যানজটের দৈব-দুর্বিপাকে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সবাইকে যাতায়াত করতে হয়। নিত্যকার সড়ক দুর্ঘটনায় কী পরিমাণ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে (?) তা পত্রিকার পাতায় চোখ বোলালেই অনুমিত হবে। সত্যিই যানবাহনের দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যাওয়া মানুষের মর্মান্তিক হতাহতের ঘটনায় হৃদয় বিগলিত হয়ে ওঠে। দুঃখজনক হলেও সত্য, পবিত্র রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনাকাক্সিক্ষত বিধিমালা জারি থাকায় সিয়াম সাধনা ও রমজানের পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।

ইসলামের সর্বপ্রধান তাৎপর্যময় পবিত্র রমজানের রোজা পালন ছাড়াও নির্বিঘ্নে ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যত্যয় ঘটেছে দেশের অধিকাংশ শহর-বন্দর ও প্রত্যন্তাঞ্চলে। সরকার চাইলে এবং প্রশাসনিকভাবে জননিরাপত্তামূলক কঠোরতার মাধ্যমে নিরাপদ ব্যবস্থাপনার দিকগুলোকে আরও সহজতর করে দিতে পারে।

পবিত্র রোজার মাসে যানবাহনের নানাবিধ দুর্ঘটনায় দেশের অনেক লোকের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। আমরা তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি। প্রতিবছর ঈদে বাড়ি ফেরার পথে অসংখ্য মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে। এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় ঈদের খুশির পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে বিষাদের ছায়া নেমে আসে।

ঈদুল ফিতরের মূল শিক্ষা হচ্ছে নিজের আনন্দ ও খুশির সাথে অপরকে যুক্ত করা। অন্যের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়া। রোজাব্রত পালনের মধ্য দিয়ে এবং মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট নিজেকে সোপর্দ করে দেওয়া। স্বীয় অনুভূতি, মন্ময়তাকে নিবিষ্টভাবে একীভূত করে ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আমরা যেন দলমত-নির্বিশেষে সেই বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখি।
সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট ও বেদনার মধ্য দিয়ে আনন্দের পরিবর্তে দুর্বিষহ জীবনগাথা যখন ফুটে ওঠে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ আর আর্থসামাজিক জীবনে, তখন আমরা ভারাক্রান্ত ও চিন্তিত হই। আমাদের সেই সব অদূরপণীয় শঙ্কাবোধ কাটিয়ে চলমান দুঃসহ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। স্বস্তি ও শান্তির পথে আমাদের অগ্রসর হতে হবে।

স্বজনহারার আর্তনাদ, দুঃখ-বেদনার মধ্যেও এবারের ঈদে সকলের মাঝে সাম্য, মৈত্রীর বন্ধন জোরদার হয়ে উঠুক। এ মুহূর্তে কবি ফররুখ আহমদের ভোরের গান কবিতার একটি লাইন মনে পড়ছে :
‘আবার উজ্জ্বল ভোর আসুক উন্মুক্ত বাতায়নে,
জাগুক প্রথম সূর্য (অযুত বৎসর আগেকার
যে সূর্য ভাঙল ঘুম আদমের, সে সূর্য আমার
বাতায়নে দেখা দিক দীপ্ত মুখে দিনে প্রাঙ্গণে)।’


‘দুর্বিষহ যন্ত্রণার ম্লান বৃন্তে সমূর্ছিত এ মন
বিষের ধোঁয়ায় নীল আচ্ছন্ন রবে সে কত দিন?
আমার প্রার্থনা শোন, দাও মুক্ত প্রভাত রঙিন;
ভোরের শিশিরে স্নিগ্ধ করো এই রৌদ্র-দগ্ধ বন।’
শান্তির বিপরীতে অশান্তি আর আনন্দের পরিবর্তে দুঃখ-কষ্ট ও শোকগাথা আর্তনাদ যতই আসুক, মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। আমাদের প্রত্যাশা, এই নিশ্চল পৃথিবী আবার জেগে উঠবে। দুঃখ-বেদনাকে জয় করে হাসি-কান্নায় আপ্লুত জনজীবনের সংকট ও প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে নিয়েই মানুষের জীবন। সকলের মাঝে তৃপ্তি, প্রশান্তি ও আনন্দধারা নেমে আসুক। সকলের মাঝে নেমে আসুক স্বস্তি ও শান্তির ছোঁয়া। ঈদ আসুক সবার ঘরে। ঈদ আসুক সবার তরে।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।