প্রচ্ছদ

হলুদ সাংবাদিকতায় সয়লাব দেশ : জাতির জন্য অশনিসংকেত !

  |  ১৬:২৪, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২০
www.adarshabarta.com

:: নাজমুল ইসলাম মকবুল ::

ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে সাংবাদিক মহাসমাবেশে অংশ নিয়েছিলাম ২০১০ এর প্রথমার্ধে। সেখানে সারাদেশের নবীন প্রবীণ হাজার হাজার সাংবাদিকের সাথে মুলাকাত করার ও তাদের মুল্যবান বয়ান শুনার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তন্মধ্যে একজন খ্যাতিমান সাংবাদিকের বক্তব্যের একটি লাইন আমার হৃদস্পন্দনে বার বার প্রতিবিম্বিত হচ্ছে এখনও। লাইনটি হচ্ছে ‘হাটে হাড়ি ভেঙ্গে দিলাম, জানিনা বাড়ী ফিরতে পারবো কি না’। আমিও এই লেখাটির মাধ্যমে অতি গুরুত্বপুর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়ে আজ হাটে হাড়ি ভেঙে দিলাম এটা জেনেও যে, এর মাধ্যমে অনেক তথাকথিত সাংবাদিকদের বিরাগভাজন হতে হবে হয়তো আজীবনের জন্য। তাছাড়া সম্পাদকদের সিংহভাগই লেখাটি তাদের পত্র পত্রিকায় ছাঁপানো দুরের কথা, পড়ে রাগ গোস্বা অভিমান করতে পারেন আমি অধমের উপর। তবুও বিবেকের তাড়নায় কলম না ধরে উপায় ছিলোনা।
কয়েক দশক যাবত সাংবাদিকতা এবং লেখালেখির জগতে বিচরণ করে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি তার মধ্যে কোনটা রেখে কোনটা লেখি তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে আমাকে। আমাদের দেশে জাতীয় স্থানীয় দৈনিক সাপ্তাহিক পাক্ষিক মাসিক ত্রৈমাসিক অনেকগুলি পত্র পত্রিকা সুনামের সাথে হচ্ছে প্রকাশিত। খোরাক যুগিয়ে যাচ্ছে পাঠকদের মনের। যে সময় যে সরকারের শুভাগমন ঘটে তাদের সুনাম সুখ্যাতির পাশাপাশি গঠনমুলক সমালোচনা ছাড়াও দেশ বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ও নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করে সর্বোপরি বিভিন্ন ব্যক্তি গোষ্টির ও দলের ভালো কাজের পাশাপাশি তাদের অন্যায় অবিচার জুলুম অনাচারের সচিত্র বিবরণ প্রকাশ করে যাচ্ছে। মজলুম জনসাধারনের অধিকার আদায় এবং দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রায় অসামান্য অবদান রাখছে সংবাদপত্র। গণতন্ত্রের পক্ষের একটি মজবুত হাতিয়ার হলো সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির সাথে সাথে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাথে দেশ বিদেশে অনেক অনেক অনলাইন পত্রিকা এবং অনলাইন টিভির আত্মপ্রকাশ হচ্ছে নিয়মিত। সোসাল মিডিয়ার কল্যাণে তাৎক্ষণিক খবর জানাজানিতো হচ্ছেই, সরাসরি লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে হরদম। বাধ্য হয়ে প্রিন্ট পত্রিকাগুলোর মালিকেরা অনলাইন সংস্করণ বা ই-পেপার প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছেন সময়ের প্রয়োজনে।
তবে যে কোন সংবাদ মাধ্যমে পেশাদার সৎ নির্ভিক সাংবাদিকরা কাজ না করলে তা বেশিদিন সচল রাখা বা সাধারন মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়। সাংবাদিকতা একটা ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সম্মানের পেশা। হামলা মামলা হতে পারে যেকোন সময়। হচ্ছেও তাই। সৎ সাংবাদিকদের উপরই মুলত হামলা মামলা হয় বেশি। বর্তমান সময়ে সৎ সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে এই কঠিন মুহূর্তেও নবীন প্রবীণ অনেক সৎ সাংবাদিক ভাইয়েরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে শক্ত হাতে কলম চালিয়ে যাচ্ছেন দুর্নীতিবাজ ধান্দাবাজ চাটুকার ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে। বিনিময়ে পাচ্ছেন বিবেকবানদের দোয়া ও ভালোবাসা। মরনের পরও মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের স্মরণ করবে তাদের কর্মের জন্য। ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম লেখা থাকবে স্বর্নাক্ষরে। পরকালেও এর জন্য পাবেন উত্তম প্রতিদান।
কথায় বলে সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। সংবাদপত্র জাতির দর্পণ। সাংবাদিকরাই সমাজের বিভিন্ন স্থরের মানুষের, রাষ্ট্রের উপরতলা থেকে নিচতলার জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা কর্মচারীদের সর্বোপরি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সুনাম সফলতা ব্যর্থতা এবং ব্যর্থতা থেকে শুধরানোর উপায় বাতলে দেন বা তুলে ধরেন প্রতিনিয়ত।

কিন্তু জাতির বিবেক যারা তাদেরওতো আত্মসমালোচনার দরকার। বেড়ায় যদি ধান খায় তাহলেতো এই বেড়া আরও বিপজ্জনক। সর্ষের মধ্যে যদি ভুতের অবাধ বিচরণ থাকে তাহলে ভুত তাড়াবেন কি দিয়ে? যাদের কাছে জাতি তথা বিশ্ববাসী অনেক কিছু পেতে আশা করে তাদের মধ্যে যদি বিষফোড়া বা ক্ষত সৃষ্টি হয় সেই বিষফোড়া বা ক্ষতের উপশম করবে কে? এদের সিংহভাগ যদি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার পরিবর্তে নিজের আখের গোছাতে স্বার্থ হাসিলের ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাহলে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালি মাধ্যম মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রন করবে কে? ধানে কিছুটা চিটা থাকাটা এক্কেবারে অস্বাভাবিক নয়, তবে তা যদি হয়ে যায় মাত্রাতিরিক্ত তবেতো কথা থেকেই যায়।
এই জাতির বিবেকদের উত্তরনের পথ কি খোলা নেই? এ পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কেহ জাতির বিবেকদের সমালোচনা করলেও মুখে করতে শুনা যায় বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থানে, কিন্তু লেখনির মাধ্যমে সমালোচনাটা তেমন একটা হচ্ছেনা। আর লেখনির মাধ্যমে সমালোচনা করলে চাকরি চলে যাবে, স্যার নারাজ হবেন কিংবা দেশ বিদেশের মানুষ হাড়ির খবর জেনে যাবেন, তখন নিজেরও মান ইজ্জত তলানিতে পড়ে যাবে, হয়তো এই ভয়ও তাড়িয়ে বেড়ায় হরদম। লেখাটি পড়ে যাদের আতে ঘা লাগবে তারা হয়তো বদদোয়া দিবেন আর বিবেকবানরা হয়তো বলতে পারেন ‘সমালোচনা না হলে শুধরাবে কে’।
ব্যাপক অনুসন্ধানে দেখা যায় সিংহভাগ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মালিকরা গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে অফিস খুলেন। অফিস প্রধান, ব্যুারো প্রধান, প্রতিনিধি এবং রিপোর্টার নিয়োগ করেন। দেশের অনেক জেলা, উপজেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশের গুরুত্বপুর্ণ শহরেও প্রতিনিধি নিয়োগ দেন। এসব প্রতিনিধির কাজ হলো নিজ এলাকার কোথায় কি ঘটছে ইতিবাচক ও নেতিবাচক খবর সংগ্রহ করে নিজ নিজ পত্র পত্রিকায় বা টিভি চ্যানেলে প্রেরণ করা।
অনুসন্ধানে দেখা যায় হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম তাদের প্রতিনিধিদের নিয়োগ প্রদান করে নিয়োগপত্রের মাধ্যমে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বাছ বিচার করে। নিয়োগপত্রে উল্লেখ থাকে চাকুরীর শর্তাবলী। পাশাপাশি উল্লেখ থাকে প্রতিনিধির বেতন সুযোগ সুবিধা কিংবা ভাতার কথাও। এর মধ্যেও দু-একটি পত্র পত্রিকা ছাড়া প্রায় সকল পত্রিকা কর্তৃপক্ষই এই ভাতার যে অংক উল্লেখ করেন তা শুধু লজ্জাজনকই নয়, চরম লজ্জাজনক বঠে। আবার কোন কোন মিডিয়া কর্তৃপক্ষ কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বেতন ভাতার উল্লেখ না করে তা গোপন রাখেন।
দু-তিন বছর জুতোর তলা ক্ষয় করানোর পর এই নিয়োগপত্রও দেন মুস্টিমেয় কিছু পত্রিকা বা মিডিয়া কর্তৃপক্ষ। দু-চারটি পত্র পত্রিকা ছাড়া নিয়োগপত্রে উল্লেখিত বেতন বা ভাতার সামান্য টাকা এবং ফোন ও ই-মেইলের বিল এবং অফিস খরছ পরিশোধ করেননা কিংবা তাদের কাছ থেকে আদায় করতে হলে শুধু শুধু জুতোর তলা ক্ষয় করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা। আজ দেবো কাল দেবো, এক বছরের একসাথে দেব, বছর শেষে পরের বছর দেব ইত্যাদি নানান ধরনের প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে পরান যায় যায় অবস্থা।
আরও মজার খবর হচ্ছে নিয়োগপত্র দিলে তাতে বেতন ভাতার উল্লেখ থাকতে হয় তাই অধিকাংশ পত্রিকা বা মিডিয়া কর্তৃপক্ষ কিন্তু নিয়োগপত্রও প্রদান করেননা। শুধু একটা কার্ড বা পরিচয়পত্র দেন এবং কাজ চালিয়ে যেতে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়ে নিয়োগপত্রের প্রলোভন দেখিয়ে বছরের পর বছর কলুর বলদের মতো খাটাতে থাকেন এবং বেশি বেশি বিজ্ঞাপন দেবার জন্য কড়া তাগাদা দিতে থাকেন। এছাড়া বছরে দু-একবার অফিসে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নীতিবাক্য শুনান আর বেশি বেশি বিজ্ঞাপন দিতে নির্দেশ দেন। নিয়োগপত্র, বেতন বা ভাতার কথা বললে কৌশলে এর জবাব এড়িয়ে অনেকেই বলে থাকেন বিজ্ঞাপন দেন। তবে কোন কোন পত্রিকা বা মিডিয়া কর্তৃপক্ষ আগেই বলে দেন বেতন টেতন ফ্যাক্স ই-মেইলের বিল টিল দিতে পারবোনা। আমাদের আয় রোজগার কম, অবস্থা খারাপ। বিনা বেতনে পুষালে ফ্রি মেহনত করতে পারেন।
অনেকেই সে ধরনের প্রস্তাবেই দারুন খুশি হয়ে শুধুমাত্র একটি কার্ডের জন্য এবং সাংবাদিক লেভেল লাগিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সুযোগ সুবিধা ভোগ করার জন্যই এসব প্রস্থাবে রাজি হয়ে নিজের পকেটের পয়সা খরছ করে ফ্রি মেহনতে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। তবে এশ্রেণীর বেশিরভাগই অদক্ষ অশিক্ষিত বেকার মতলববাজ কিংবা অর্ধশিক্ষিত। আবার কেহ কেহ শখের বশে কিংবা অভিজ্ঞতা লাভের পর পরবর্তীতে ভালো একটি পত্রিকায় সুযোগ বুঝে ঢুকে পড়ার টার্গেট নিয়েও ফ্রি সার্ভিস দিতে দেখা যায়।
মাগনা খাটানোতে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের শতভাগ লাভ। তবে যাদেরকে মাগনা খাটানো হয় তারা মাগনা খেটে আয় রুজি কেমনে করেন, নিজে কেমনে চলেন সে প্রশ্নটাই থেকে যায়। অনেক সময় স্থানীয় প্রতিনিধিরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করতে বিভিন্ন জায়গায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। গাড়ি ভাড়া পকেট থেকে দিতে হয় কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তেল ভরতে হয়, মোবাইলের বিল পরিশোধ করতে হয়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মুল্যবান সময় ও অর্থ নষ্ট করে সংবাদ সংগ্রহ করে নিজের বাপের পয়সায় ক্যামেরা কিনে ছবি তুলে আবার কম্পিউটারে সংবাদ লিখে ছবিকে ঠিকঠাক করে ক্যাপশন লিখে ই-মেইলের বিল নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করে পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিয়ে আবার বার্তা সম্পাদককে বিনয়ী কন্ঠে নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে ফোন করে সংবাদ প্রেরণের কথা জানিয়ে পরের দিন ছাপানোর জন্য বার বার তাগিদ দিয়ে তৈলাক্ত অনুরোধ করা হয়। অনেকে বলে থাকেন প্রায় পত্রিকার বার্তা সম্পাদককে নাকি মাঝে মধ্যে সম্মানসূচক ফ্ল্যাক্সিলোড বা বিকাশে মাল না পাঠালে বেচারা নাকি ফোনও ধরতে সময় পাননা কিংবা দেবো বলে কষ্ট ও খরছ করে পাঠানো সংবাদটিও না দিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হাতটা একবারও কাপেনা। তাদের নাকি মোবাইলে কোন দিন নিজ থেকে ফ্ল্যাক্সিলোড করা লাগেনা বরং বিনা মেহনতে পাওয়া সম্মানসূচক ফ্ল্যাক্সিলোড থেকে বউ বাচ্চা শালা শালিদের আরও লোড শেয়ার বা ভাগাভাগি করতে পারেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রতিনিধিদের পকেটের অর্থে প্রেরিত শ্রম ও ঘামে ঝরা সংবাদ দিয়ে পত্রিকার মালিকেরা পত্রিকা ছাঁপেন, টিভির মালিকেরা তাদের ভিউয়ার বাড়ান ও চুটিয়ে ব্যবসা করেন, তাদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন আদায় করেন, সংবাদ পাঠাতে বিলম্ব হলে অথবা তাদের ফরমায়েশমতো যথাস্থানে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে না পারলে প্রায়সময় ধমক দিতেও কসুর করেননা। ডান বাম কিংবা বিভিন্ন মতাবলম্বী পত্রিকা হলে তাদের ফরমায়েশমতো সংবাদ প্রেরণেরও নির্দেশ থাকে। নতুবা কচুপাতার পানির মতো চাকরি চলে যাবারও নির্দেশনা আগেই দেয়া থাকে। অনেক সময় কর্মের মুল্যায়ন না করে নিজের খেয়াল খুশিমতো লাত্থি মেরে বের করে দিতেও শুনা যায়।
এখন আলোচনা করা যাক কলুর বলদের মতো কাদেরকে খাটাতে সংবাদমাধ্যমের অসাধু মালিকদের আরাম বেশি। অনুসন্ধানে দেখা যায় হাতে গোনা দু’চারটি গণমাধ্যম ছাড়া অধিকাংশ গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ জেলা উপজেলা প্রতিনিধিদের নিয়োগ দেন যোগ্যতার বা শিক্ষা দীক্ষার ভিত্তিতেতো নয়ই, বরং খাতির সুপারিশ নতুবা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আদায়ের বিনিময়ে। এই অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বহু ধরনের বহু কিসিমের হতে পারে যা জানতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বকে পুঁজি করে অধিকাংশ মিডিয়া কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন জেলা উপজেলা প্রতিনিধিদের বিনা বেতনে খাটিয়ে তাদের লুটেরা বানাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু তাদের নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছেন কৌশলে। তাদের এটা ভালোভাবেই জানা যে, বিনা বেতনে ইচ্ছেমতো খাটাতে হলে অযোগ্য অশিক্ষিত গন্ডমুর্খ বেকার অদক্ষ লোকদের দরকারই বেশি। তাই প্রতিনিধি নিয়োগ দেবার সময় শিক্ষাগত যোগ্যতা পাঠশালা পাশ কি না, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় কোন দিন গিয়েছে কি না, শুদ্ধভাবে একটি সংবাদ লেখা দুরের কথা তিন দিনের ছুটি চেয়ে প্রধান শিক্ষকের নিকট একটি ছুটির দরখাস্ত লিখতে পারবে কি না তা বাছবিচার না করেই প্রতিনিধি নিয়োগ প্রদান করেন অধিকাংশ তথাকথিত সম্পাদক বা তাদের সাঙ্গাপাঙ্গরা। কোথাও কোথাও দেখা যায় ইতিপুর্বে বিভিন্ন ধরনের যেমন রিকসা ভ্যান ঠেলা ভটভটি করিমন নছিমন ইমা লেগুনা বাস ট্রাক বা রাইসমিলের ড্রাইভার, হ্যালপার, রাজ কাট রং মেস্তরি, যোগালি, ধুপা, নাপিত, মুছি, দালাল, টাউট, চোরাকারবারী, আদম ব্যাপারী, হুন্ডি ব্যবসায়ী ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত ছিল বা আছে কিন্তু পরবর্তীতে সময় সুযোগমতো এরাও সাংবাদিকের খাতায় নাম লেখাতে তেমন একটা বেগ পেতে হয়না। আমাদের সাবেক প্রয়াত এক মন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সম্মানজনক সকল পেশায় লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমেই শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি যাচাই বাছাই করা হলেও আমাদের দেশে ওই একটি পেশায় শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন দরকার পড়েনা। সেই মহান পেশাটি হচ্ছে সাংবাদিকতা!
অনুসন্ধানে দেখা যায় দেশের প্রায় অধিকাংশ জেলা উপজেলাতে প্রতিনিধিদের বিরাট একটি অংশ হাই স্কুলের বারান্দায় না গিয়েও সাংবাদিকতার কার্ড বুকে ঝুলিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে হম্বিতম্বি করে বেড়ায় এবং দালালীসহ বিভিন্ন মাধ্যমে টু-পাইস কামিয়ে এ মহান পেশাকে কলুষিত করে। আবার কোন কোন সংবাদ মাধ্যমের মালিক বিভিন্ন স্থানে বিনা বেতনে একাধিক প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে এমনকি ইউনিয়ন ওয়ার্ডে ও গ্রামে গ্রামে প্রতিনিধি দিয়ে খেলা লাগিয়ে নিজে রেফারির ভুমিকা নিয়ে বিজ্ঞাপন টিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন ধরনের ফায়দা হাসিল করেন এবং সময় সুযোগমতো ওদেরকে ছুড়েও ফেলে দেন।
এখন কথা হলো বেতন ভাতা না পেয়ে এরা মাগনা কাজ করে কিসের বিনিময়ে! অনুসন্ধানে দেখা গেছে কিছু কিছু অসাধু তথাকথিত সাংবাদিক বুদ্ধি শুদ্ধি বাতলিয়েও নাকি দেন কিভাবে কামাই রোজগার করতে হয়। আবার অনেকে টু-পাইস কামানোর ধান্দা শিখে নেয় বিভিন্ন মাধ্যমে।
বেশ কয়েক বছর পুর্বে এক সাংবাদিকের বেতন ভাতার খবর জানতে চাইলে উত্তরে বলেন ‘ভাইছাব এ পেশায় মাল কামাতে হলে অবৈধ পন্থা ছাড়া উপায় নেই। বেতন টেতন নেই, তবে সিস্টেম জানা থাকলে মাসে বিশ পঁচিশ হাজার টাকা কামানো মামুলি ব্যাপার। এর থেকে বেশিও অর্থাৎ আনলিমিটেড কামাই করা যায়। কোন কোন সময় একদিনেও বড় দান মারা যায়।’ বললাম বুঝলামনা! বিষয়টা একটু খোলাসা করে বলো। বললেন যেমন ধরুন পুলিশ স্পর্শকাতর কোন বিষয় নিয়ে কিংবা সাজানো মামলায় একটা আসামী ধরে থানায় আনলো, বেচারা হয়তো সম্মানিত অথবা টাকাওয়ালা লোক। তখন ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলা হলো। সুযোগমতো জানানো হলো আপনার ছবি ও সংবাদ কাল পত্রিকায় আসবে। লোকটা মান ইজ্জতের ভয়ে তখন নিজ থেকেই বলবে, ভাই দয়া করে আমার ছবিটা পত্রিকায় দিয়েননা। তখন বলতে হবে ভাই আমি চাকরি করি, ছবিটা আমার দিতেই হবে। তখন লোকটা পাঁচ দশ হাজার কিংবা সামর্থমতো একটা অংকের টাকার মাধ্যমে দফারফা করে আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে পকেটে দিয়ে দিলে আর সে ছবি ও সংবাদ পাঠানো হয় না। কেহ কেহ বড় অংকের টাকার বিনিময়ে তার সিন্ডিকেটের সকলের কন্ট্রাক্ট নিয়ে বড়ো দান মারতেও শুনা যায়। এছাড়া বিপরীতও আছে যেমন, কম পরিচিত কর্মী বা নেতাকে গ্রেফতার করা হলে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ার জন্য ও নেতৃত্বে প্রমোশন হওয়ার জন্য ছবি তুলে পত্রিকায় দেওয়া দরকার। তখন ছবি তুলে পত্রিকায় দেবার জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে মাল ঢুকে পকেটে। আবার অনেকের চরিত্র হননের জন্য বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যও তার প্রতিপক্ষ অসাধু রিপোর্টারের কাছে গিয়ে বিভিন্ন অংকের টাকা দিয়ে রিপোর্ট করায়। প্রতিপক্ষের কোমর শক্ত হলে কিংবা মানহানির মামলা করবে বলে আশংকা করা হলে বুদ্ধি শুদ্ধি বাতলিয়ে দেওয়া হয় যে, আপনার প্রতিপক্ষকে আসামী করে এসব বিবরণ এজাহারে উল্লেখ করে একটি সাজানো মামলা কিংবা জিডি অথবা প্রশাসনের অন্য কারো কাছে অভিযোগ বা স্মারকলিপি দিয়ে রিসিভকৃত কপির ফটোকপি নিয়ে আসেন, সাথে মালপানি বা খরছাপাতি দেন, তখন নিউজ করতে আর অসুবিধে নেই।
আমাদের দেশে মিথ্যা মামলা করতে তেমন একটা তকলিফ করতে হয়না তা প্রায় সবারই জানা। মামলা বা অভিযোগ দায়ের হলেই সত্য মিথ্যা উদঘাটন না করে অমুকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগে মামলা দায়ের কিংবা জিডি বা স্মারকলিপি পেশ। মামলার বিবরণে, স্মারকলিপিতে বা এজাহারে অথবা জিডিতে প্রকাশ……….. ইত্যাদি লিখে ভালো মানুষেরও চরিত্র হরন করে টু-পাইস কামানোর চটকদার সুযোগ হলো এই একটি আরামদায়ক এবং সহজ পদ্ধতি। অনেক সময় বিভিন্নজনের স্পর্শকাতর যে কোন বিষয়আশয় জেনে ফোনে বা বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদপত্রে প্রকাশের হুমকী ধামকী দিয়েও টু-পাইস কামানোর সংবাদ শুনা যায়। এছাড়া সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন স্থরের কর্মকর্তা কর্মচারীর ঘুষ দুর্নীতির কিংবা অপরাধীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তাদের মুখোশ উদঘাটনের হুমকী দিয়েও নিয়মিত কিংবা মাসোহারা ভিত্তিতে টু-পাইস কামাতেও শুনা যায়। কোথাও কোথাও থানার দালালী করে চুটিয়ে ব্যবসা করতেও শুনা যায়। কতিপয় অসাধু স্টাপ রিপোর্টার বা বার্তা সম্পাদকরা নিউজ ছেপে কিংবা আটকে রেখেও টু-পাইস কামাতে শুনা যায়।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, কিছু অদক্ষ অযোগ্য অশিক্ষিত লোকেরা সাংবাদিকতার মহান পেশাকে কলুষিত করে জাতির যে ভয়াবহ ক্ষতি করে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা না হলে তা দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারন করবে সন্দেহ নেই। সিলেটের এক সিনিয়র সাংবাদিক একদিন কথা প্রসঙ্গে বললেন, প্রেসক্লাবে যেতে মন চায়না। কারণ বিভিন্ন বাজে পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল এমন কিছু অদক্ষ অশিক্ষিত ছেলেদের সাংবাদিকতার কার্ড দিয়ে থাকে সেখানে গেলে ওদের পাশাপাশি বসতে শরম করে। টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা ও আসবাবপত্র যারা বহন করে ওদেরকেও সাংবাদিকতার এক ধরনের কার্ড দেয়া হয়। অনেক সাংবাদিক সে নিজেই জানেনা সাংবাদিকতার সংজ্ঞা এবং ফটো সাংবাদিকতার সংজ্ঞা! বড়ো বড়ো সমাবেশ বা মিছিল হলে সেখানে গিয়ে অথবা পুলিশের সামন দিয়ে দৌড় ঝাপ দিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ক্যামেরা এপাশ ওপাশ করে ছবি ধারনের কসরত করে মনে মনে ভাবে দেখো আমি কতো বড়ো সাংবাদিক।
অনুসন্ধানে দেখা যায় এসব অদক্ষ অযোগ্য অশিক্ষিত দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা তথাকথিত সাংবাদিকদের কারণেই দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা উপজেলায় সাংবাদিক ও প্রেসক্লাবের মধ্যে বিভেদ বিভ্রান্তি গ্রুপিং একাধিক ও বহুসংখ্যক প্রেসক্লাবের জন্ম হয়। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য অশিক্ষিত দালাল লুটেরারাই সকল অশান্তির মুল।
সংবাদপত্র হচ্ছে জাতির আয়না। দেশ ও জাতির উন্নয়ন অগ্রগতি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের ত্রুটি বিচ্যুতি তুলে ধরে তা সংশোধনের পথ বাতলে দেয়ার ধারক ও বাহকের বিরাট অংশকে যদি কোন বেতন ভাতা না দিয়ে পাল্টা নিয়োগ দেবার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা পয়সা আদায় করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মুর্খ দুর্নীতিবাজ ঠগ বাটপার ও লুটেরাদের দিয়ে মহান এ পেশাকে কলুষিত করা হয় আর কতিপয় সংবাদমাধ্যমের মালিকেরা নিজের পকেট ভারি করেন, তবে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের গতিপথ কোন দিকে যাবে সে বিচারের ভারাভার বিজ্ঞ পাঠকমহলের উপরই ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মুর্খ ও দুর্নীতিবাজ তথাকথিত সাংবাদিকেরা নিজে সংবাদ লিখতে না পেরে অন্যের কাছ থেকে ধার করে সংবাদ প্রেরণ করে। এজন্যই দেখা যায় অধিকাংশ পত্রিকায় একই সংবাদ একই ধরনের এবং হুবহু কপি করা। আবার কোথাও কোথাও কর্তৃপক্ষ নাকি বেতনতো দেওয়া দুরের কথা প্রতিনিধিদের কাছ থেকেও নাকি টু-পাইসের অংশ বা মাসোহারা নিয়ে থাকেন নিয়মিত। এজন্য অনেকেই ব্যঙ্গ করে সাংবাদিক ভাইদের সম্বোধন করেন সাংঘাতিক বিশেষনে। তবে এক সাংবাদিক সাংঘাতিক বিশেষনে খুশি হয়ে এর সংজ্ঞায় বলেছিলেন, এরা কতোই সাংঘাতিক যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাদুকরী পারফরম্যান্সের মাধ্যমে লুটেরা দুর্নীতিবাজদের হাড়ির খবর কিংবা পুলিশের বেধড়ক পিটুনি মারামারি গুলাগুলির সময় নিজের জানের মায়া ত্যাগ করে ছবি তুলে তা সংবাদপত্রে প্রেরণ করে।
অনেক অযোগ্য অপদার্থরা ভুলে ভরা শব্দপ্রয়োগের মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করতে দেখা যায়। আবার অনেকে শিরোনামেও ভুল করে। একবার কয়েকটি অনলাইনে এক সংবাদ শিরোনাম দেখে হতবাক হয়েছিলেন অনেকেই। বক্তা বক্তব্যে প্রবাসীদের বার বার দেশে আসার বিভিন্ন কারন উল্লেখ করলেন। সাংবাদিক নিউজের শিরোনাম দিলো ‘নারীর টানে প্রবাসীরা বার বার দেশে আসেন’। নাড়ি আর নারীর পার্থক্য না বুঝে নিউজের শিরোনাম যারা দেয় তাদের ছাটাই করার কোন সম্ভাবনা বা খোয়াব দেখে কোন লাভ নেই। কারন ওদের দাপটই সর্বত্র। সৎ নির্ভীক নির্লোভ কিংবা নির্ভেজাল সাংবাদিকরা সর্বত্রই কোনঠাসা। ছবি তোলার কোন নীতিমালাও জানেনা। পবিত্র স্থান মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ বা দোয়া আদায়রতো মসজিদের ইমাদের সামনে গিয়েও ক্যামেরা তাক করে ছুটাছুটি ও নানান অঙ্গভংগী করতে দেখা যায় এদেরকে।
বর্তমানে বিভিন্ন সমস্যা সম্ভাবনা বা কার্যক্রম লাইভ সম্প্রচার করা হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই লাইভ সম্প্রচার। তবে যারা এ কাজ করেন তাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন আছেন যারা নিজস্ব মেধা ও যোগ্যতাবলে অবস্থান করে নিয়েছেন সকলের হৃদয়ে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় দেখা যায় নতুন নতুন লাইভ ব্যবসায়ীদের দৌড়ঝাপ। এরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে পরিচয় দেয় সাংবাদিক বলে। তাদের মধ্যে অনেকেই কখন কোথায় কিভাবে লাইভ করতে হয় তাও বুঝেনা। ঠান্ডা গরম না বুঝে যত্রতত্র শুরু করে দেয় লাইভ। ধারাভাষ্যে যা বলে তা শুনে অনেকেই হেসে গড়াগড়ি করতেও দেখা যায়। এছাড়া সংশ্লিষ্টদের অনুমতি ছাড়া তাদের কার্যক্রম লাইভে সম্প্রচার করাও কতটুকু যুক্তিসংগত তাও ভেবে দেখা দরকার। তবে কোথাও দুর্নীতি অনিয়ম অব্যবস্থাপনা যে কারো দৃষ্টিগোচর হলে স্ব উদ্যোগে নিজের মোবাইল দিয়ে লাইভের মাধ্যমে প্রচার করলে উপকৃত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র।
এত্তোসব ভেজালের ভিড়ে এখনও কিছু নির্ভীক কলম সৈনিক সৎ সাংবাদিক আছেন যারা সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজের শ্রম ও মেধাকে কাজে লাগাচ্ছেন নিঃস্বার্থভাবে, প্রকাশ করে যাচ্ছেন পত্র পত্রিকা, সর্বোপরি দেশ ও সমাজের উন্নয়নে রেখে যাচ্ছেন তাদের অসামান্য অবদান। তাদের সততার নজির দেখলে শ্রদ্ধা জানাতে হয় বিনয়ের সাথে।

লেখকঃ সভাপতি, সিলেট লেখক ফোরাম।