প্রচ্ছদ

জীবন কথা, পর্ব-৩৭

  |  13:46, July 08, 2020
www.adarshabarta.com
Photo courtesy of Mahfuzur Rahman

Manual8 Ad Code

সিলেটের লন্ডনী সমাচার

Manual6 Ad Code

:: মোঃ রহমত আলী ::

Manual4 Ad Code

আমি যখন প্রথম যুক্তরাজ্যে আসি তখন একটি বিশেষ কাজে স্থানীয় এমপির কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল। কিন্তু কিভাবে এমপির স্মরণাপন্ন হওয়া যায় তা আমার জানা ছিল না। আমি তখন যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরীর (সাবেক এমপি) কাছে জানতে চেয়েছিলাম তা কিভাবে সম্ভব হবে। তিনি তখন আমাকে বলেছিলেন যে, এপয়েন্টমেন্ট করে তার ‘সার্জারীতে’ যেতে হবে। আমি তখন ‘সার্জারী’তে যাওয়ার অর্থ বুঝতে পারি নাই। তাই তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলাম যে, আমারতো কোন অসুখ-বিসূখ হয় নাই, তাই সার্জারীতে যাব কেন? তিনি তখন আমাকে যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তাতে আমি এটুকু বুঝেছিলাম যে, মানুষের কোন সমস্যা হলে সেটাকেও একটা রোগ মনে করা হয়। তাই প্রকৃত রোগের জন্য যেভাবে ডাক্তারের সার্জারীতে যেতে হয় তার চিকিৎসার জন্য, সেভাবে মানুষের কোন কাজের ব্যাপারে সমস্যা হলে তা সমাধানে জন্য যিনি উপযুক্ত তার কাছে যেতে হয়। তাই আমার মনে হলো এটাকে ‘সার্জারীর’ সাথে সমন্বয় করা হয়েছে।

সে যাই হোক, আমি এপয়েন্টমেন্ট করে এমপির সার্জারিতে গেলাম। তখন যেহেতু বৃটেনে কোন এমপির সার্জারিতে প্রথম যাত্রা, তাই কয়েকটি বিষয় আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল। প্রথমত: এমপি সাহেব যখন আসলেন তখন দেখলাম তিনি অতি সাধারণভাবে অনেকটা এখানে আসা অন্য দর্শনার্থীদের মতই অফিসে ঢুকলেন। এ সময় কেউ উঠেও দাঁড়াল না বা হাত মিলানোর চেষ্টাও করলো না। দ্বিতীয়ত: যখন একজনের সাক্ষাৎকার শেষ হলো তখন অন্যজনকে নেয়ার জন্য তিনি নিজে চেয়ার থেকে উঠে এসে নাম ধরে ডেকে তাকে রোমে নিয়ে গিয়ে প্রথমে দর্শনার্থীকে বসিয়ে পর তিনি নিজে বসেন। এরপর ক্ষেত্র বিশেষে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই সমস্যা জেনে নিয়ে তার সেক্রেটারীকে এ ব্যাপারে কি করতে হবে তার নির্দেশনা দেন। আমার কাজ শেষ হওয়ার পর অনেকটা উপযাচক হয়ে তিনি যখন আমার সাথে হাত মিলিয়ে নিলেন তখন আমি বুঝলাম যে, আমাকে সেখান থেকে বিদায় নেয়ার বার্তাই তিনি দিচ্ছেন। তাই আমি বাইরে চলে আসলাম। এরপর এভাবে তিনি একে একে ডেকে নিয়ে যান এবং কাজ শেষে রুমের বাইরে নিয়ে এসে বিদায় জানান।

Manual7 Ad Code

আমি তখন চিন্তা করলাম আমাদের দেশে কোন জনপ্রতিনিধির কাছে সমস্যা নিয়ে গেলে প্রথম তার সাক্ষাৎ পাওয়াটাই ভাগ্যের ব্যাপার। এ জন্য প্রথমে হয়তো তার সাথে ঘনিষ্ঠ কাউকে খোঁজে বের করতে হবে। এরপর সাক্ষাতের জন্য গেলে হয়তো জানা যাবে, সেদিন তিনি অফিসেই আসেন নি অথবা আসলেও বিশেষ জরুরী কাজে বের হয়ে গেছেন। কিন্তু কখন ফিরবেন সেটাও অনিশ্চিত। তাই সেদিন বিফল হয়ে ফিরে আসতে হয়। এভাবে কয়েকদিন হাঁটার পর যদি কোন সময় সে প্রতিনিধির দর্শন পাওয়া যায় তবে সমস্যার কথা একান্তে বলার মত কোন পরিবেশ পাওয়া যায় না। কারণ অনেকের অনেক সমস্যা আছে যেগুলো অন্যের সামনে বলতে নেই। দেখা যাবে, সেই জনপ্রতিনিধির রুমে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কাগজপত্র হাতে নিয়ে, কেউবা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। এর সাথে দেখা যাবে সেই জনপ্রতিনিধির কিছু ঘনিষ্ঠ লোক আছেন যারা খোশগল্প ও চা পানে ব্যস্ত চতুর্দিকে। এরপর হঠাৎ এমপির হয়তো ফোন আসলো আর অমনি তিনি তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেলেন। এমতাবস্থায় যিনি সমস্যা নিয়ে গেলেন তার অবস্থা কি হয় তা সহজেই অনুমেয়। এটাকে তখন তুলনা করা যায়, “দেখা হলে কথা হলো না” সংবাদের শিরোনামের সাথে।
তবে কাজ যে, হয় না তা কিন্তু একেবারে সঠিক নয়। অনেকের কাজ কিন্তু তাৎক্ষনিকভাবেই হয়ে যায়। কারণ আমাদের দেশে এখনও ‘মামু ভাগ্নে‘ প্রথা চালু আছে। ‘মামু ভাগ্নে ছাড়াও আরো কিছু পদ্ধতি আছে।

যেমন, আমি একবার দেশে আমার এক বিশেষ প্রয়োজনে এক জনপ্রতিনিধির কাছে গেলাম। অবশ্য এর আগে টেলিফোন করা হয়েছিল, আমি সেখানে যাচ্ছি বলে। তাই আমাকে সেখানে যাওয়ার পর প্রথমে দাঁড়িয়ে কোশলবার্তা, চা নাস্থা, এরপর অনেকের কাজ রেখে আমার একটি কাজ সমাপ্ত করা হলো। তখন সেখানে সমবেত অনেকেই আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন।
আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। আমি তখন লন্ডনের একজন জনপ্রতিনিধির বাংলাদেশ সফরের সঙ্গী ছিলাম। আমরা গিয়েছি ঢাকার একজন মেয়রের সাথে দেখা করার জন্য। আমরা যথাসময়ে সেখানে গিয়ে পৌছলাম। তখন আমাদেরকে একটি রুমে বসতে দেয়া হলো। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকতে হয়। এর মধ্যে অনেকেই যাচ্ছে, আসছে কিন্তু আমাদের আর ডাক পড়ে না। এমতাবস্থায় আমাদের একজন সঙ্গী সেই জনপ্রতিনিধির সাথে থাকা চেইন গলায় পরিয়ে দিলেন। আর তখনই দেখা গেল সবাই তৎপর হয়ে উঠেছে। সাথে সাথে মেয়রের ডাকও পড়ে গেল। তবে রোমে পৌছার সময় মেয়র বসা ছিলেন কিন্তু আমাদেরকে দেখে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ালেন। সাথে সাথে অনেকটা ‘নবাগত বরের’ মত এগিয়ে নিয়ে গেলেন। মনে হলো তাকে যদি ভালভাবে আগে অবহিত করা হতো তবে গাড়ি থেকে নামার পর এগিয়ে নিয়ে আসতেন। এরপর চা নাস্থা, ফটো তোলা ইত্যাদি হলো। যখন বিদায় নিয়ে আসলাম তখন বাইরে এসে অনেক্ষন আমরা হাসলাম।

আমি একবার ঢাকায় একটি বড় অফিসে যাওয়ার দরকার পড়লো। ভাবলাম এভাবে গেলে হবে না। একটু কায়দা করে যেতে হবে। তাই আমাদের সংগঠন হিউম্যান রাইটস এন্ড পীস ফর বাংলাদেশ এর কেন্দ্রয়ি প্রেসিডেন্ট এডভোকেট মনজিল মোরসেদ সাহেবের গাড়িতে করে সিকিউরিটিসহ সেখানে গেলাম। তখন ছিল দীর্ঘ মেয়াদী তত্ত¡াবধায় সরকারের সময়। অফিসের সামনে গিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। সিকিউরিটিও আমাকে কাউন্টার পর্যন্ত এগিয়ে দিল। এমতাবস্থায় সে অফিসে যাওয়ার পর অনেকে মনে করলো হয়তো আমি কোন হাই লেভেলের কেউ হবো। তাই কাউন্টারে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই কাজটি সমাধা হয়ে গেল। এরপর চলে আসলাম।
আরো একটি ঘটনা। আমি একবার সেন্টার ‘ফর এন আর বি’ এর চেয়ারম্যন জনাব সেকিল চৌধুরীর আমন্ত্রনে দেশে গিয়ে ঢাকায় একটি কনফারেন্সে যোগদান করি। এ সময় সেখানে উপস্থিত একজন বড় কর্তার সাক্ষাৎ লাভ করি। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করে পরের দিন তার সাথে দেখা করতে যাই। আমি তখন সে অফিসে গিয়ে কোন কোল-কিনারা পাচ্ছিলাম না। তখন এ কার্ডটি প্রদর্শন করে তার সাথে সাক্ষাৎ করার কথা বলি। এরপর আমাকে বেশ কয়েকটি ধাঁপ অতিক্রম করে সেখানে পৌছতে তেমন কোন বেগ পেতে হয়নি। যাদেরকেই এ কার্ড দেখিয়েছি তারাই আমাকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন। এরপর তার সাথে দেখা করে চলে আসলাম।

আমার ছেলের বিয়ের সময় আমার নিজ উপজেলার একজন কর্তা সাহেবকে কার্ড দিয়ে আমন্ত্রন জানালাম বিয়েতে উপস্থিত থাকার জন্যে। তিনি তখন নানা ব্যস্ততার কথা বলছিলেন। আমি তখন কিছুটা হতাশ হলাম। ভাবলাম, তিনি যখন এত ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন তখন জেলা পর্যায়ের কাউকে দাওয়াত দিলেতো আর আশাই করা যাবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় চলে যাব আমার বন্ধু কমকর্তার কাছে। সেখানে যাওয়ার পর তিনিকে আমন্ত্রন জানালাম বিয়েতে উপস্থিত থাকার জন্যে। তিনি ব্যস্ততা দেখালেও আমার আমন্ত্রন ফেলে দিলেন না। বললেন, তিনি অন্য কাউকে বলে দিচ্ছেন সম্ভব হলে উপস্থিত থাকার জন্যে। এই বলে তিনি সিলেটের একজনকে ফোন করে আমার ছেলের বিয়েতে উপস্থিত থাকার কথা বললেন।

Manual6 Ad Code

এরপর তিনি আমাকে বিষয়টি অবহিত করলেন। আমি তাঁর এ ভ‚মিকায় খুব একটা আশান্বিত ছিলাম না। মনে করেছিলাম যে, আমাকে একটা শান্তনা দেয়ার জন্য তা করেছেন। কিন্তু বিয়ের আগের দিন রাত্রে সেই উপজেলা পর্যায়ের আমন্ত্রিত কর্মকর্তার কাছ থেকে ফোন পেলাম জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা বিয়েতে উপস্থিত থাকার কথা বলেছেন। তখন আমি ‘এক সাথে দ’ুজনকে বর যাত্রি হিসাবে পেয়ে গেলাম। তারা পরদিন যথা সময়ে অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। (চলবে)।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রবীণ সাংবাদিক ও দর্পণ ম্যাগাজিন সম্পাদক। ইমেইল: rahmatali2056@gmail.com

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code