প্রচ্ছদ

নাজমুল ইসলাম মকবুল এর কলাম : লাফ দিয়ে পার হওয়া যাবে বাসিয়া নদী !

  |  ১৫:২৩, জুন ১২, ২০২০
www.adarshabarta.com

 

বিশ্বনাথের প্রাণ বাসিয়া নদী। আমি বাসিয়া পারের সন্তান। গর্ব করেই বলি বাসিয়া আমার ঠিকানা। বাসিয়া আমার অহংকার। বাসিয়া নদী নিয়ে অনেক কবিতা ছড়া গান লিখেছি সেই কিশোর বয়স থেকেই। সেই আশির দশকের শেষের ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর কথা। সেসময় বিশ্বনাথ থেকে মাসিক বিশ্বনাথ দর্পণ নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো। সম্পাদক ছিলেন বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরতো সিনিয়র সাংবাদিক মোঃ রহমত আলী। মাসিক বিশ্বনাথ দর্পণসহ সিলেটের এমনকি জাতীয় এবং দেশের বাইরেরও বিভিন্ন পত্রিকায় বাসিয়া নদী নিয়ে লিখেছি অনেক।

কালের স্বাক্ষী সুরমা নদীতে যার উৎসমুখ সেই সুরমা নদীর মাসুকগঞ্জ বাজারের কাছ থেকে কামাল বাজার মুন্সীর বাজার লালাবাজার হয়ে বিশ্বনাথের বুক চিরে যে দৃষ্টিনন্দন নদীটি ভাটির দিকে প্রবাহিত হয়েছে সেই ঐতিহ্যবাহী নদীর নাম বাসিয়া নদী। এককালে এই নদীতেই বড় বড় পাল তোলা নৌকা চলতো পত পত করে, হাওয়ার তালে তালে। হাওয়ার উল্টো দিকে যেতে হলে মাঝিরা গুন টেনে, দাঁড় টেনে নৌকা দিয়ে পরিবহন করতেন মালামাল কিংবা যাত্রী সাধারনকে। মাঝিরা ভাটিয়ালি সুরে গান ধরতেন মনের সুখে, মনানন্দে।

বাসিয়া নদীতেই বর্ষা মৌসুমে হতো রংয়ের নৌকা বাইচ। বর কনের নৌকা চলতো বিভিন্ন সাঁজে রংয়ে ঢংয়ে। নদীর বিভিন্ন স্থানে বড় বড় মোহনা (ডর) ছিল। ডরের প্রচন্ড বেগের ঘুর্ণি¯্রােতে কন্যা নৌশা ও বরযাত্রীদের নৌকা পানির নিচে তলিয়ে যাবার গল্পও শোনা যেতো। অনেকে বলতেন নয়া কন্যা নউশাকে মাত্তা বা দেওলায় নাকি নিয়ে যেতো। প্রশস্ত ও গভীর খরস্রোতা নদীতে নাকি মাত্তা বা দেওলা থাকতো। এছাড়া সারা বছরই নাইওরীর নাও বা গয়নার নাও শোভা পেতো বাসিয়া নদীতে। নাইওরীর নাও বা গয়নার নাও চড়ে শ্বশুর বাড়ীসহ আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে বেড়াতে যেতে দেখা যেত বাসিয়া বা এর শাখানদী কিংবা হাওর বাওরের মাঝ দিয়ে।

সে সময় খানদানী পরিবারের প্রায় প্রত্যেকেরই ঘাটে থাকতো ডিঙ্গি নৌকা। ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে বাজারে যাওয়ার মজাই ছিল আলাদা। এছাড়া ডিঙ্গি নৌকায় মালামাল পরিবহণ থেকে শুরু করে অনেক কিছুই বহন করা হতো বাসিয়া নদী দিয়ে। বর্ষা মৌসুমে বালি পাথরের নৌকা এসে ভিড়ত নদীর তীরে বাজারের পার্শ্বে। বিশেষ করে বিশ্বনাথ বাজারে বালি পাথরের নৌকার লাইন থাকতো অনেক লম্বা। ক্রেতারা দেখেশুনে কিনতেন বালি পাথর। নিজ নিজ ঘাটে গিয়ে ভিড়ত নৌকা। মাঝিরা মাথা দিয়ে বহন করে বাড়িতে পৌছে দিয়ে আসতেন বালি পাথর। ডমকা (্িব্রক ফিল্ড) থেকে ইটও নিয়ে আসা হতো নৌকা দিয়ে বাসিয়া নদী কিংবা তার শাখানদী দিয়ে।

আবার বড় বড় লঞ্চ ষ্টিমার দাঁপিয়ে বেড়াতো এই বাসিয়া নদীর বুক চিরে। বাসিয়া নদী নিয়ে অনেক কবিতা গানও রচনা করেছেন অনেক কবি সাহিত্যিক গীতিকার আউল বাউলেরা। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এই বাসিয়া নদীতে ডর (মোহনা) নেই, কথিত মাত্তা কিংবা দেওলাও নেই, পাল তোলা নৌকা নেই, গুণ বা দাড় টানার চমৎকার দৃশ্য নেই, প্রচন্ড বেগের স্্েরাত নেই, লঞ্চ বা স্টিমারের দাপাদাপি নেই। যেন নির্জীব একটি মরা খালে পরিণত হয়েছে বিশ্বনাথের প্রাণ বাসিয়া। এই কদিন পুর্বেও যে খরস্রোতা বাসিয়া নদীর আয়তন ছিল তার বেশিরভাগই এখন আর অবশিষ্ট নেই বলে অভিমত এতদাঞ্চলের প্রবীণ মুরব্বিয়ানদের। বিশ্বনাথের গরু হাঠার পার্শ্বের ডরসহ বিভিন্ন ডর বা মোহনা এবং বাকগুলোও ভরাট হয়ে বাসা বাড়ি দোকান পাঠ ও কলোনি নির্মিত হয়েছে।

বিশ্বনাথ বাজারের উত্তরপাড় থেকে দক্ষিনপাড় অথবা দক্ষিনপাড় থেকে উত্তরপাড়ে যেতে হলে খেয়া নৌকায় পার হতে হতো। পরবর্তীতে বাসিয়া নদীতে সেতু নির্মিত হলে উভয়পাড়ের মধ্যে যোগাযোগের পথ সহজ হয়। শুধু বিশ্বনাথ বাজার নয় বিশ্বনাথ বাজারের কিছুটা পূর্ব দিকে রজকপুরের ডরের পার্শ্বে, টেংরার রথবাড়ি বাজারের পার্শ্বে, লালাবাজার, কামাল বাজারসহ বিভিন্ন জায়াগায় খেয়া ঘাট ছিল। বর্ষা মৌসুমে খর¯্রােতা বাসিয়া নদী পারাপারে খেয়া নৌকায় উঠতে বুক দুরু দুরু করতো। বাসিয়ার বাঁকসহ বিভিন্ন জায়গায় ছিল অনেকগুলি ডর বা মোহনা। কিন্তু এখন আর ডরতো নেইই বরং তা ভরাট হয়ে পরিণত হয়েছে ক্ষেতের জমিন, দোকান পাঠ, কলোনি ও বাসা বাড়িতে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই ঐতিহ্যবাহী বাসিয়া নদী একটি ছড়া বা নালায় পরিণত হবে যা অনায়াসে পার হওয়া যাবে লাফ দিয়ে!

অনুসন্ধানে জানা গেছে বাসিয়া নদীর উৎসমুখ এতই সংকুচিত হয়ে পড়েছে যে সুরমা নদী থেকে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধই বলা চলে। ফলে উৎসমুখ থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার নদী বর্তমানে প্রায় বিলীন হয়ে অবৈধ দখলদারদের ক্ষেতের জমীতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ভুমিখেকো দখলদাররা অবাধে দখল করে নির্মাণ করছে দোকান গৃহ মার্কেট কিংবা ঘর বাড়ী বাসা মার্কেট দোকানকোঠা কলোনিসহ অবৈধ স্থাপনা। দিন দিন নদীতে পলি জমে ভরাট হলেও কারো মাথাব্যথা নেই। বরং দখলদাররাই হচ্ছে দিন দিন আঙুল ফুলে কলাগাছ, তালগাছ কিংবা বটগাছ। বাসিয়া নদী বিলীন হতে থাকায় অনেক দেশীয় প্রজাতির মিঠা পানির মাছের দেখাও আর পাওয়া যায় না। বিলীন হচ্ছে আমাদের মুল্যবান মৎস্য সম্পদও। এছাড়া বাসিয়া নদীর শাখা চরচন্ডী নদীসহ বিভিন্ন শাখানদীও ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে গেছে।

‘‘লাফ দিয়ে পার হওয়া যাবে বাসিয়া নদী” শিরোনামে একটি রিপোর্ট করেছিলাম প্রায় দশ বছর পূর্বে। তখন জাতীয় স্থানীয় দেশি বিদেশী বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছিল ফলাও করে। এর কিছুদিন পর পরই ৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত সন্তানদের সংগঠন ‘মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম’র পক্ষ থেকে তৎকালীণ এম.পি আলহাজ্ব শফিকুর রহমান চৌধুরীর কাছে বাসিয়া নদীর উৎসমুখ থেকে শুরু করে পুরো নদীটি খননের দাবীতে বিশ্বনাথবাসীর পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপি প্রদান করি আমরা। দাবীটির প্রতি একাত্মতা পোষন করে স্মারকলিপি প্রদানকালে আমাদের সাথে এম.পি মহোদয়ের সিলেটস্থ টিলাগড়ের বাসায় যান বিশ্বনাথের ব্যবসায়ীমহলসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। সংসদ সদস্য মহোদয় খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাদের দেয়া স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন। সেসাথে আমাদেরকে পরামর্শ দেন যে, জরুরি ভিত্তিতে বাসিয়া নদী খননের জন্য বরাদ্ধ চেয়ে আমি স্মারকলিপিটিতে একটি সুপারিশ লিখে দিতেছি এখনই। আপনারা সংগঠনের পক্ষ থেকে কপিটি পানি উন্নয়ন বোর্ডে জমা দিয়ে দেন। বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য আমি ফোন করেও সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষকে বলে দেবো। মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম’র পক্ষ থেকে আমরা স্মারকলিপিটি জরুরি ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডে জমা দেই। পরবর্তীতে জানা গেল বাসিয়া নদীর উৎসমুখ থেকে শুরু করে বিশ্বনাথ বাজারের বাসিয়া সেতু পর্যন্ত নদীটি খননের জন্য কোটি টাকারও বেশি সরকারী বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে শুরু হয় ড্রেজিংয়ের কাজ। কিন্তু কাজ শুরুর সুচনাতেই ড্রেজিং কাজে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেক লেখালেখিও হয় মিডিয়াতে।

বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সে সময় সিলেট-২ আসনে নতুন এম.পির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয় পার্টির তরুন নেতা ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া। একদিন তিনি আমাকে ফোন করে জানালেন, বাসিয়া নদী খননের জন্য বিশাল বরাদ্ধ এসেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা বলে অভিযোগ আসছে। লোক দেখানো দায়সারা গোছের কাজ করছে কন্ট্রাক্টররা এমন অভিযোগ করছেন সচেতন মহল। আপনারা এ ব্যাপারে আরও লেখালেখি এবং স্বোচ্ছার ভুমিকা পালন করলে কিছুটা কাজ হতে পারে।

আমি বললাম আমাদের আন্দোলন ও স্মারকলিপি প্রদানের ফলেই এ বিশাল বরাদ্ধ এসেছে। বরাদ্ধ পরিমাণ কাজ না হলে আমরা লেখালেখি ও আন্দোলন চালিয়ে যাবো। তিনি বললেন আমি আগামী কাল উপজেলা পরিষদের সামনে নদী খনন পরিদর্শনে আসবো। কন্ট্রাক্টরকেও উপস্থিত থাকার জন্য বলেছি। আপনারা থাকলে আরও ভালো হবে। আপনারা লেখালেখি ও আন্দোলন করলে আমরা এ ব্যাপারে কথা বলতে কিছুটা সুবিধে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে এম.পি উপস্থিত হলেন। সেসময় স্থানীয় সাংবাদিকসহ সচেতন অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেসময় সচেতন অনেকেই খননকাজে অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরেন। এম.পি মহোদয়ও খনন কাজে নিয়োজিতদের সঠিকভাবে কাজ করার জন্য তাগিদ দিলেন ও অনিয়মের নিদর্শনগুলি সরেজমিন দেখিয়ে দিলেন। খনন কাজে অনিয়মের বিরুদ্ধে সচেতন বিশ্বনাথবাসী এমনকি কৃষকদের পক্ষ থেকেও হলো বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন, মানবন্ধন, লেখালেখি।

এর পুর্বে বিশ্বনাথ বাজারের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাসিয়া নদীর উভয় তীরের শুধুমাত্র ঘাস ছিড়ে তাদের কার্য সমাধা করেছিল। আন্দোলনের পরে কিছু কিছু জায়গায় আলতো করে সামান্য মাটি চেছেই কার্য সমাধা হয়েছে বলে সমাপ্তি দিলো।

বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সাংবাদিকদের কাছে খবর আসতে লাগলো যে, টুকটাক লোকদেখানো উপরি খনন করে অসাধু ঠিকাদাররা জনগনের ট্যাক্সের বিশাল অর্থতো হাতিয়ে নিচ্ছেই, পাশাপাশি বিশ্বনাথ বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় খনন না করার জন্যও নাকি অনেক ভুমিখেকোরা ঠিকাদারদেরকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ দেন। এজন্য নাকি ঠিকাদারদের লাভ হয়েছে ডাবল। খননকাজে অনিয়মের সঠিক তদন্ত চান সচেতন বিশ্বনাথবাসী। আগামীতেও বাসিয়া নদী খনন প্রকল্পের কাজে এ ধরনের লুটপাট হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করছেন সচেতন মহল। এ ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে সকলকে। স্বোচ্ছার ভুমিকা পালন করতে হবে সচেতন বিশ্বনাথবাসীকেই।

বিশ্বনাথের প্রাণ বাসিয়া নদী রক্ষার জন্য সকলেই একমত। আন্দোলনও চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ মানবাধিকার কর্মীরা। পালন হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসূচি। আমাদের সংগঠন মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম’র পক্ষ থেকে বিশ্বনাথের প্রাণ বাসিয়া নদীকে বাঁচাতে এবং বিশ্বনাথবাসীকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সকলের সকল আন্দোলন সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানাই। পাশাপাশি দল মত নির্বিশেষে সকলকে আরও স্বোচ্ছার ভুমিকা পালনের জন্য জানাই বিনীত অনুরোধ। কারন বাসিয়া নদীটি বিলুপ্ত হলে এতদাঞ্চলের পানির স্থর আরও নীচে নেমে যাবে। শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া মুশকিল হবে। বোরো ও সবজি চাষে নেমে আসবে চরম বিপর্যয়। আর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি আটকে থেকে সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতার। সর্বোপরি আমাদের পরিবেশের উপর পড়বে বিরূপ প্রভাব। হারিয়ে যাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। জীববৈচিত্র হতে থাকবে বিলুপ্ত।

বাসিয়া নদী সঠিক মাপমতো খনন করে বিশ্বনাথবাসীকে অকাল বন্যার হাত থেকে রক্ষাসহ হারিয়ে যাওয়া নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এখন বিশ্বনাথবাসীর প্রাণের দাবী।

লেখক:

সভাপতি, সিলেট লেখক ফোরাম

০১৭১৮৫০৮১২২