প্রচ্ছদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঁচদিন

  |  ১০:১৮, মে ১৫, ২০২০
www.adarshabarta.com

:: নাজমুল ইসলাম মকবুল ::

বিশ্বের তাবৎ ভ্রমনপিপাসুদের আকর্ষনীয় এবং পছন্দের তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাত শীর্ষে। এর কারনও অনেক। পর্যটকদের জন্য যেভাবে ঝকঝকে সুন্দর এবং পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে আরব আমিরাতকে তা সেখানে উপস্থিত হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে স্বচক্ষে এবং না ছুঁয়ে দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাছাড়া আরব আমিরাত ভৌগলিক দিক দিয়েও পৃথিবীর মধ্যবর্তী গুরুত্বপুর্ণ স্থানে এবং সমুদ্রতীরে অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সুবিধা বিস্তর। সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে এর পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে দেখার এবং লেখার ইচ্ছে ছিলো বহুদিনের। দেখবো দেশটির ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো, উপভোগ করবো এর অপরূপ প্রাকৃতিক ও আর্টিফিসিয়াল সৌন্দর্য, কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক বন্ধুদের নিয়ে সেখানে আয়োজন হবে সাহিত্য আড্ডার এবং আমার কোন একটি গ্রন্থ বা সঙ্গীতের অ্যালবামের হবে প্রকাশনা উৎসব। অবশেষে সবগুলো স্বপ্নই বাস্তবায়ন হলো, সফল আমিরাত ভ্রমণের মাধ্যমে। প্রাণভরে উপভোগ করলাম ভ্রমণের প্রতিটি মুহুর্ত, প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি দিন।

দুই মাসের টুরিস্ট ভিসা পেয়েছিলাম আমিরাত ভ্রমণের জন্য। যার সময়সীমা ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ১৩ নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত। ভিসায় উল্লেখ ছিল এরমধ্যে সর্বোচ্চ একমাস সেখানে অবস্থান করা যাবে। ভিসা পাওয়ার পর সময় করতে পারছিলামনা ট্রাভেল করার। এদিকে ভিসার সময়সিমাও অতিক্রম হবার পথে। অবশেষে অন্তিম সময়ে মাত্র পাঁচদিনের ভ্রমণপরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের টিকিট কনফার্ম করলাম। দুই মাসের ভিসাপ্রাপ্তির শেষদিকে ১২ নভেম্বর নিজ দেশে ফেরার এবং ৬ নভেম্বর সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওয়ানা হবার পরিকল্পনা নিয়ে।

৬ নভেম্বর সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানে ফ্লাইট ছিলো দুপুর ১২.২০এ। আমার বাড়ী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌছানোর জন্য সিলেটের প্রবীণ সাংবাদিক কলামিষ্ট আফতাব চৌধুরী পাঠালেন নিজের গাড়ীটি। পৌছলাম বিমানবন্দরে।

প্রথমেই ইমিগ্রেশনের পূর্বে যখন লাগেজ ও হাতের ব্যাগ স্ক্যানের জন্য দিলাম তখন দেখলাম আরেকজন যাত্রীর লাগেজ আটকে দেয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলছেন আমরা প্রবাসী মানুষ। কয়েকবছর পর পর দেশে আসি মা-বাপ আত্মীয় স্বজনদের দেখার জন্য। বিদেশ যাবার সময় যদি নিজের গাছের এবং মায়ের হাতের দেয়া দুচারটি লেবু ব্যাগে করে নিতে না পারি তাহলে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর হতে পারেনা। কথাগুলো শুনে তাকালাম এখানে দায়িত্বরতো কর্মকর্তার দিকে। তার চেহারা ছুরতে যেন কিছু একটা গ্রহণ করার অপেক্ষা। আমি এসব শুনে ফেলায় তার যেন সমস্যা হচ্ছে বুঝতে পারলাম।

স্মরণ হলো ২০১৭ তে যখন সৌদি আরবে পবিত্র ওমরাহ পালনে যাই তখন আমার সাথে সুনামগঞ্জের একজন প্রবীণ মুরব্বী ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে, ছেলের বৌ ও নাতি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে স্থায়ীভাবেই থাকেন। তাদের আবদারমতো ওই মুরব্বী ওমরাহতে যাবার সময় তাদের জন্য তরিতরকারি কাটতে একটি বটি দা এবং কিছু ছোট ছোট ডেগ ডেগচি অন্যান্য মালামালের সাথে লাগেজের ভেতরে করে নিচ্ছিলেন। ওই একই জায়গায় স্ক্যান করার সময় আটকে দিয়ে বলা হলো এগুলো নেয়া যাবেনা। কিছুক্ষণ পর নগদ বারো হাজার টাকা নিয়ে বটি দা, ডেগ ডেকচিসহ ওই মুরব্বীর লাগেজ ছেড়ে দিয়েছিলেন বিমানবন্দরে দায়িত্বরতো কর্মকর্তা। বিষয়টি বিমানে উঠার পূর্ব মুহুর্তে আমাকে জানান ওই মুরব্বী। আমি বললাম আপনি টাকা দিলেন কেন। টাকা দিলে যদি এসব নেয়া বৈধ হয়ে যায়, তাহলে টাকা ছাড়াওতো এগুলো নেয়া বেআইনি হওয়ার কথা নয়। আপনাকে কি টাকার কোন রসিদ দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন না। বললাম, আমি এক্ষুনি এই টাকা নেয়ার কারন অনুসন্ধান করতে চাই। কিন্তু ফ্লাইটে উঠার সময় হয়ে যাওয়ায় আর সে অনুসন্ধান সম্ভব হয়নি তখন।

বেশ কয়েকবছর পূর্বে আমার সর্বকনিষ্ট বোন স্থায়ীভাবে বসবাসের ভিসা নিয়ে প্রথমবার যুক্তরাজ্যে যাবার সময় সবকিছু ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও ওসমানী বিমানবন্দরে কর্তব্যরতো এক কর্মকর্তা বিমানে আরোহনের পূর্বমুহুর্তে তাকে আটকে দেন। সাথে সাথে টাকা দিলে ছেড়ে দেবার কথাও শুনান। এসব শুনে ওই মুসিবত থেকে উদ্ধারের জন্য একই ফ্লাইটেই যুক্তরাজ্য ভ্রমণকারী তৎকালীণ বিশ্বনাথ পুরাণ বাজারের মাছহাটা জামে মসজিদের ইমাম হাফিজ মাওলানা শরফুদ্দিন আজাদ নিজের পকেট থেকে নগদ এক হাজার টাকা ওই কর্মকর্তার হাতে দিয়ে মুশকিল আহসান করেন। টাকা পকেটস্থ করে ওই কর্মকর্তা ফ্লাইটে উঠতে দেন আমার বোনটিকে। বিমান ছেড়ে দেবার সময় নিকটবর্তী হওয়ায় এবং প্রথম ভ্রমন ও একা ট্রাভেল করার কারনে বিষয়টি আমার বোন তৎক্ষণিকভাবে আমাকে ফোনে জানাতে পারেনি।

ঢাকায় পৌছার পর ওই ইমাম সাহেব এবং আমার বোন আমাকে তা ফোনে জানালে আমি সেসময়কার ফ্লাইট নং এবং ফ্লাইটের সময়সহ এসব বিস্তারিত উল্লেখ করে পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করি। ওসমানী বিমানবন্দরে মুক্তিযোদ্ধার কন্যাকে হয়রানী শিরোনামে জাতীয় পত্রিকাসহ লন্ডন ও দেশ বিদেশের আরও কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নিউজটি। গণমাধ্যমে নিউজ প্রকাশ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টির দিকে নজর আসে সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের। শুরু হয় তদন্ত। বিষয়টির সত্যতা জানতে আমার নিজ বাড়ীতেও আসেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে হয়রানীকারী টাকা গ্রহণকারী ওই কর্মকর্তার শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। আমার আব্বার কাছে বারবার ফোন করে দেখা করার সুযোগ চেয়ে অনুরোধ করতে থাকে। ক্ষমা চায় এবং টাকাটাও ফেরত দিতে চায়। তিনি সে সুযোগ না দিয়ে বলেন তদন্তে যা হবার হবে। সুযোগ না পেয়ে আমার এলাকার এক চেয়ারম্যানের দ্বারস্থ হয়। ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ আছে এবং বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কিছুদিন বিশ্বনাথ থানার ওসির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে পরবর্তীতে জানা যায়। চেয়ারম্যান আমার আব্বাকে বললেন, হাজী সাহেব, ওই ব্যক্তি বিশ্বনাথ থানার ওসি থাকাবস্থায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে এতো তেল মারলাম, আর এতো টাকাকড়ি দিলাম, কোন দিনতো উল্টো আমাকে তেল মারেনি এক ফুটাও! সংবাদপত্রে একটি রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে ওই ব্যক্তি আমার দ্বারস্থ হয়ে বিষয়টি সুরাহা করে দেয়ার জন্য এবং আপনি তাদেরকে মাফ করে দেয়ার জন্য আমাকে যে তেল মারতেছে, কল্পনা করতে পারতেছিনা। আপনি মাফ করে দিন। ওই চেয়ারম্যানও দুর্নীতিবাজ ওই কর্মকর্তার হয়ে মাফ চান এবং মাফ করে দিতে অনুনয় বিনয় করে বারবার ক্ষমা চান। কোন অভিযোগ নাই এই মর্মে একটি স্বাক্ষর দিতে অনুরোধ জানাতে থাকেন বারবার। তার মধ্যস্থতায় তাদের সাথে একটি বৈঠকের সুযোগ দিতেও সময় চান আমার আব্বার নিকট। নতুবা দুর্নীবাজ ওই কর্মকর্তার পানিশমেন্ট হতে পারে এবং বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে জানান। আমার আব্বা সে সুযোগ দিতে সব সময়ই অপারাগতা প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ ওই কর্মকর্তার পক্ষ থেকে এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে আমার আব্বার নিকট আসা ফোনগুলোর কথোপকথন আমি রেকর্ড করা শুরু করি। রেকর্ড করা শুরু করলে তারা তা বুঝতে পেরে মাফ চাওয়া, তেলমারা ও স্বাক্ষর নেওয়ার অনুনয় বিনয় এবং অনুরোধ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তার একটা বিচার হয়েছিল বলে জেনেছিলাম।

পুরণো এসব স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে এবার সামনে এগিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট টিকিট দিলাম বোর্ডিং কার্ডের জন্য। লাগেজে স্টিকার লাগিয়ে ব্যাল্টে পাঠিয়ে দিয়ে সিলেট টু ঢাকা ও ঢাকা টু দুবাই দুটো বোর্ডিং কার্ড হাতে নিয়ে কি যেন একটু ভাবলেন ওই কর্মকর্তা। এরপর আমার হাতে বোর্ডিং কার্ডগুলো না দিয়ে রেখে দিলেন টেবিলে। বললেন আপনার বোর্ডিং কার্ডতো ইস্যু করে দিয়েছি। লাগেজও চলে গেছে। আমাদের স্যার আসবেন কিছুক্ষণ পর। এসে আপনার বোর্ডিং কার্ডগুলো ও টিকিট চ্যাক করবেন। আপনি একটু হাটাহাটি করে পান খেয়ে আসেন। শুধু আমার পাসপোর্টটি হাতে দিলেন। ওই কক্ষের প্রবেশদ্বারের কাছে রাখা চেয়ারে বসে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। আরবী একটি প্রবাদ আছে ‘‘আল ইনতেযারু আশাদ্দু মিনাল মউত’’। অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কষ্টকর। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আবার গিয়ে বললাম ভাই অবস্থা কি। আপনার স্যার কবে আসবেন। ওই ব্যক্তি বললেন এইতো কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবেন। এভাবে প্রায় আধঘন্টা সময় অতিবাহিত হলো। পরবর্তীতে পাশের চেয়ারের ওই ব্যক্তি তশরিফ আনলেন। বললেন আপনি কি করেন, দুবাই কেন যাবেন, সেখানে যাবার পর আপনার ব্যবসা কে দেখবেন এসব আরও অনেক প্রশ্ন। পরবর্তীতে যখন জানতে পারলেন যে আমি সাংবাদিকতা করি তখন বললেন সে পরিচয় আগে দেবেনতো ভাই। বললেন দিয়ে দাও উনাকে উনি সাংবাদিকতা করেন।

এবার গেলাম ইমিগ্রেশনে। তখন ইমিগ্রেশনের বেচারাও কিছুটা বাতচিত করার পর বললেন ওই টেবিলে আমাদের স্যারের সাথে একটু আলাপ করেন। ওদের স্যারও কিছু বাতচিত করার পর কার সাথে যেন ওয়াকিটকিতে আলাপ করলেন। বললেন স্যার, একজন সাংবাদিক বেড়াতে যাবেন দুবাই। কি করবো। দিয়ে দেই স্যার। পরবর্তীতে আবার আগের টেবিলে যেতে বললেন। যাবার পর উনি পাসপোর্টএ ষ্ট্যাম্প দিয়ে বললেন যান।

বিষয়টি অন্যান্য যাত্রীরা শুনে বললেন দুবাই ট্যুরে যাওয়া যাত্রীরা এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট না করলে নাকি যেতে দেয়া হয়না। পার্টি ভেদে টাকার অংক নাকি কমে বাড়ে। আমাকে আটকে রেখে তারা নাকি মালপানির জন্য একটু অপেক্ষা করেছিলেন। তারা আরও বলেন, সাংবাদিক জানতে পেরে বিনা টাকায় আপনাকে যেতে দেয়া হয়। মজার অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং তাদের লিলাখেলা নিজ চোখে অবলোকন করে অবশেষে বেলা ১২.২০এ বিজি ০৬০২এ উড়াল দিয়ে প্রায় চল্লিশ মিনিট আকাশে উড়ে অবশেষে পৌছলাম রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশন্যাল এয়ারপোর্ট। সেখানে আমাদেরকে খাওয়ানো হলো দুপুরের খাবার। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আবার চেক-আপ করে বিমানে উঠার জন্য নির্ধারিত অপেক্ষার জায়গায় নিয়ে বসানো হলো। কয়েকঘন্টা অপেক্ষার প্রহর শেষে অবশেষে উঠানো হলো বিমানে এবং ১৮.৩০ টা অর্থাৎ বিকেল ৬.৩০টায় দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে উড়াল দিলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিজি ০০৪৭। উল্লেখ্য সরাসরি সিলেট থেকে দুবাইগামী ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়ায় পদে পদে সিলেটী যাত্রিদের দুর্ভোগ দেখে মনটা ভরে গেল বিষাদে। এছাড়া বাংলাদেশ বিমানের সিটগুলোর অবস্থাও খুবই নাজুক। অনেকটা বাসের সিটের চেয়েও ছোট এবং নড়াচড়ার জায়গা খুবই কম। সিটগুলোর অবস্থার উন্নতি করতে পারলে ও সেবার মান বাড়াতে পারলে বিমানের যাত্রী সংখ্যা আরও বৃদ্ধি সম্ভব হতো বলে জানালেন যাত্রীদের অনেকেই।

প্রায় ছয় ঘন্টা আকাশে উড়ার পর গভীর রাতে দুবাই সময় ২২.১৫ তে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং ব্যস্থতম বিমানবন্দর দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণ করলাম। উইন্ডোর পার্শ্বে সিট থাকায় অবতরনের সময় সেখানকার কাছের এবং দুর বহুদুরের বর্ণিল আলোকসজ্জা, মনেরমতো সাজানো জ্বলজ্বল করা প্রজ্জলিত বাতির আলোকচ্ছটা দেখে পুলক অনুভব করলাম। দেখা গেলো গোটা শহরের গাড়ি চলাচলের চমৎকার ও চোখধাধানো দৃশ্যও।

এয়ারপোর্ট অবতরণ করে দ্রুতগতির মেট্রো ট্রেনে চড়ে অন্যান্য যাত্রীসহ গেলাম নির্ধারিত কাউন্টারে। শত শত বাঙ্গালী যাত্রীদের বিশেষকরে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের স্বদেশে ছুটি কাটিয়ে ফিরে যাবার দৃশ্য দেখে মনো হলো জায়গাটি সে সময়ের জন্য যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। সিংহভাগ যাত্রীরই পোষাক পরিচ্ছদ তেমন একটা সাজানো গোছানো নয়। এসবের সময়ও নেই যেন তাদের। দু-একজন ছাড়া অগণিত বাঙ্গালী যাত্রীদের কারো পরণেই স্যুট বা ব্ল্যাজার চোখে পড়েনি। শ্রমিক হিসেবেই তাদের দেশে আসার আনন্দ। আবার শ্রমিক হিসেবেই তাদের কর্মস্থলে ফেরা। দ্রুত নিজ নিজ কর্মস্থলে গিয়ে পৌছার তাড়া যেন তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হলো।

সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাড়ালেন সকল যাত্রী। লাইন এগুচ্ছে সামন দিকে। এগিয়ে গেলাম কর্তব্যরতো কর্মকর্তার কাউন্টারে। পাসপোর্ট হাতে দিতেই দায়িত্বরতো কর্মকর্তা দ্রুত আনুষ্ঠানিকতা সেরে পাসপোর্ট ও ভিসার পাতায় শিল দিয়ে এক্সিটের দিকে ইশারা দিলেন হাসিমুখে। বের হতে হতে ভাবলাম আমাদের দেশের বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সেবা আর দুবাই এয়ারপোর্টের কর্মকর্তাদের সেবার মধ্যে এতে ব্যবধান কেনো। এ যেন আকাশ পাতাল তফাৎ। আচানক ব্যবহারই আমরা পাচ্ছি আমাদের নিজ দেশে পদে পদে। আমি যে ছালামতে দুবাই পৌছেছি পৌছার পরও অনেক সাংবাদিক বন্ধু বিশ্বাস করতে পারেননি। তারা বলেন আপনি কি সত্যিই দুবাই এসে পৌছেছেন। কারন হিসেবে তারা জানান, তাদের জানামতে মোটা অংকের মাইনে না দিলে নাকি এয়ারপোর্টে আটকে দেয়া হয়।

ইমিগ্রেশন শেষে সামনে এগিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন বন্ধু স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী এয়ারপোর্টে উপস্থিত হয়ে অপেক্ষা করছেন আমাকে তাদের নিজ নিজ বাসায় নিয়ে যেতে। সকলেই চাচ্ছেন তাদের বাসায় গিয়ে যেন উঠি। কাকে খুশি করি আর কাকে নারাজ করি সে চিন্তায় পড়ে গেলাম সেখানে। এরই মধ্যে সেখানকার প্রতিষ্ঠিত ও সুনামধন্য ব্যবসায়ী আমার প্রিয় আজিজুল ভাই বললেন আপনাকে আমার গাড়িতেই উঠতে হবে। বাকী স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের বুঝিয়ে সুজিয়ে পরদিন এবং সুবিধামতো সময়ে তাদের বাসায় যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উঠলাম আজিজুল ভাইয়ের গাড়িতে। এরই মধ্যে আজিজুল ভাই শুধু গাড়ি পার্কিং বাবৎ কয়েকদফায় বাংলার কয়েকহাজার টাকা কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করেন।

দুবাই এয়ারপোর্টে আমাদের মাদরাসার সাবেক প্রধান হাফিজ সাহেব এবং সেখানকার একটি মসজিদের ইমাম হাফিজ মোঃ ফজলুর রহমান সাহেবের পরিশ্রম ও আতিথেয়তা সত্যিই অতুলনীয়। পাশাপাশি আমার প্রিয় ভাই সাবেল ও হামদুমিয়াসহ বাকী স্বজরাও আমার জন্য যে সময় দিয়েছেন ও কষ্ট করেছেন তা ভুলার নয় কখনো।

প্রিয় আজিজুল ভাই বছরকয়েক পূর্বেই জানিয়ে রেখেছিলেন দুবাই যদি আপনি ভ্রমনে আসেন তাহলে দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে আপনাকে রিসিভ করা থেকে শুরু করে থাকা খাওয়া ও যেথায় যেতে চান সেখানে আমার নিজের গাড়িযোগে নিয়ে যাওয়া, ঘুরাঘুরিসহ দেশে ফেরারদিন এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌছানোর দায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে দেবেন। করেছেনও তাই। কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে রাখলেন আজীবনের জন্য।

নিজ গাড়িতে তুলে নিজের পার্শ্বের সিটে বসিয়ে নিজে ড্রাইভ করে গল্প করতে করতে রওয়ানা দিলেন নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দুবাইয়ের সুনাপুরের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌছে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আমাকে বসালেন পাশের চেয়ারে। দেখালেন প্রতিষ্ঠানটি। বর্ণনা দিলেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের। দিনের হিসাব কিতাব বাকী রেখেই আমাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্ট চলে গেছিলেন, তাই কম্পিউটারে হিসাব কিতাব সমাধা করলেন আমাকে পার্শ্বে বসিয়ে রেখেই। মিলালেন ক্যাশও। অতঃপর একসাথে সম্পন্ন করলাম রাতের খাওয়া দাওয়া। আমার জন্য পূর্ব থেকে নির্ধারন করা জায়গায় ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালের নাস্তার পর আমার প্রিয় চাচাতো ভাই সাবেল গাড়ি নিয়ে হাজির আমাকে নেবার জন্য। সাবেল থাকে দুবাইয়ে টুরিস্টদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষনীয় জায়গা সাগরপারের নিকটবর্তী জুমারায়। সাবেলের বাসা থেকে দুবাইয়ে অবস্থিত পর্যটকদের আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু সাত তারকা হোটেল বুর্জ আল আরবের দৃষ্টিনন্দন রূপ দেখা যায় অনায়াসে। একটি কক্ষে সাবেল ও রাজন দু-ভাই থাকেন খুবই আরামে। সাবেল আগেই আমার জন্য তার বাসায় ব্যবস্থা করে রেখেছিল থাকার। বলেছিল ভাইছাব, যে কয়দিন থাকেন, আমার এখানে থাকবেন আপনি। আমাকে দুবাইয়ের বিভিন্ন পর্যটন স্পট দেখানের জন্য পরিকল্পনাও করে রেখেছিল। সে অনুযায়ী আমাকে নিয়ে সে নিজে এবং সঙ্গী সাথীদেরসহ বিভিন্ন চমৎকার জায়গা পরিদর্শনের সুযোগ করে দিয়ে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে রাখে।

সাবেলের গাড়িতে উঠতেই সবার প্রিয় লালভাইয়ের ফোন। লালভাইয়ের দেশের বাড়ী মাধবকুন্ডের নিকটে। থাকেন জুমারায়। সাবেলের বাসার নিকটেই। লালভাই জানতে চাইলেন মেহমানকে নিয়ে কখন আসছো। সাবেল জানালো, আমার গাড়িতে করে নিয়ে আসছি এখনই। লালভাই বললেন খাবার দাবার রেডি করে অপেক্ষা করছি। সাবেলের বাসায় গিয়ে লালভাইয়ের সাথে কুলাকুলি করে মজাদার খাবার খেলাম দুপুরের। এরপর কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর লালভাই আমাকে নিয়ে চললেন সাগর দেখাতে ও সাগর সৈকতে ঘুরতে।

দেখলাম বিশ্বের অন্যতম সেরা হোটেল দুবাইয়ের বুর্জ আল আরব। বুর্জ আল আরব হোটেল দূর থেকে দেখলে একে বিশাল একটি চমৎকার পাল তোলা নৌকার মতো কিংবা তিমি মাছের মতো দেখায়। দুবাইয়ের সমুদ্রের তীর থেকে ২৮০ মিটার ভেতরে কৃত্রিম একটি দ্বীপের উপর এটি নির্মাণ করা হয়েছে। বুর্জ আল আরবের সাজসজ্জা অত্যাধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন। এর সৌন্দর্য দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। ‘বুর্জ আল আরব’-এর অর্থ হচ্ছে আরবের সম্মান। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে এই হোটেল দেখতে হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন প্রতিদিনই। এর উপরে হেলিকপ্টার নামার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নির্মাণ করা হয়েছে চমৎকার হ্যালিপ্যাড। ‘বুর্জ আল আরব’ এর দিকে তাকালে একেক সময়ে একেক ধরনের রূপে দেখা যায়। দিনের বেলায় রৌদ্রের আলোর ঝলকানির সাথে সাথে এর রূপও ঝলক দেয়, কাছে টানে। সকাল ও বিকেলের দৃশ্যও মনোরম। রাতের দৃশ্য আরও চমৎকার। দৃষ্টিনন্দন আলোর ঝলকানির প্রদর্শন হয় প্রায় রাতেই।

‘বুর্জ আল আরব’ এর নিকটেই হাটাহাটি করলাম সমুদ্র সৈকতে দীর্ঘক্ষণ। দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ। তাই ভালো লাগলো খুবই। বিশ্বের অগণিত টুরিস্ট পুরুষ নারীরা এসেছেন সমুদ্রের পারে। মনের সুখে সাগরের স্বচ্ছ পানিতে সাতার কাটছেন টুরিস্টরা। কেহবা খেলা করছেন নানা ধরনের ছোট বড় বুট কিংবা ওয়াটার সাইকেল দিয়ে। কেহবা খেলা করছেন বালি দিয়ে। বালির উপর আঁকাআঁকি করছেন মনের মতো করে। কেহবা নিজ বন্ধুকে বালি দিয়ে ঢেকে বা শরিরে বালির প্রলেপ দিয়ে মজা করছেন খুব। কেহবা ছবি তুলছেন আচ্ছামতো। কেহবা বসে বসে প্রাণভরে উপভোগ করছেন সাগরের নির্মল বাতাস। কেহবা তন্ময় হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন অপরূপ দৃশ্যের মাঝে। স্বচ্ছ পানি ও ঢেউয়ের দোলায় মনকেও দোলাচ্ছেন অনেকেই। তন্ময় হয়ে ভাবছেন সৃষ্টিরহস্যের কথাও। অবগাহন করছেন রূপসাগরে।

মনে পড়লো আমাদের দেশের ককসবাজার এবং পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের কথা। আমাদের ককসবাজার এবং পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের চেয়ে অনেক পরিপাটি করে সাঁজানো গুছানো এবং পরিচ্ছন্ন সেখানকার পরিবেশ। কোথাও ময়লা আবর্জনা নেই। নিরাপত্তাহীনতার লেশমাত্রও নেই সেখানে। আশপাশের বিল্ডিং হোটেল বাসা বাড়ী ও মার্কেটগুলো খুবই দৃষ্টিনন্দন এবং চোখধাধানো। পরিকল্পিতভাবে বানানো। মরুভুমিতেও পরিকল্পিতভাবে লাগানো চমৎকার গাছগাছালি, লতাগুল্ম ও ফুলবাগানের দৃষ্টিনন্দন সমারোহ। আমাদের ককসবাজার এবং পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে দেখা যায় সিংহভাগ পর্যটকই দেশের। আর দুবাইয়ে সিংহভাগ পর্যটক ইউরোপ আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা।

সেখানে হাটার সময়ও কেহ আইন লঙ্গন করেননা। রোড পারাপারের সময় পথচারিরা সুইচ টিপে সবুজ বাতি জ্বলার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এমনকি গাড়ি না থাকলেও। সবুজ সংকেত পাওয়ার পর পথচারিরা রোড অতিক্রম করেন। বাতি ছাড়াও অন্যান্য স্থানে কোথাও পথচারি রোড অতিক্রম করবেন এমন পর্যায়ে দেখামাত্র চালক গাড়ি থামিয়ে আগে পথচারিকে যেতে দেন। পথচারি রোড অতিক্রম করার পর চালক গাড়ি নিয়ে চলেন। এমন আচরন আমাদের দেশে আকাশ কুসুমই মনে হয়। আমি বুর্জ খলিফার সামনে একটি রোড পার হয়ে অন্য প্রান্তে যাবো, এমন সময় একটি গাড়ি আসছে দেখে ফুটপাতে দাড়িয়ে যাই। কিন্তু গাড়ির চালক গাড়ি দাড় করিয়ে আমাকে ইশারা দেন আমি যেন আগে রোড অতিক্রম করি। আমি রোড অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে থাকলেন। দৃশ্যটি দেখে অবাক হয়ে লাল ভাইকে বললাম ব্যাপার কি। তিনি বললেন এদেশে টুরিস্টদের সম্মান সর্বাগ্রে। তারা সর্বোচ্চ সম্মান করেন টুরিস্টদের। এটাই এখানের নিয়ম।

ঘুরাঘুরি শেষে বাসার পাশ্ববর্তী মসজিদে নামাজ আদায় করলাম আমরা। লক্ষ্য করলাম সেখানকার প্রায় সকল মসজিদ একই ধরনের ডিজাইনের। একই ধরনের সুদৃশ্য গম্বুজ রঙ এবং নান্দনিক ডিজাইনে করা হয়েছে নির্মাণ। সবগুলো মসজিদের নির্মাণশৈলীতেই শৈল্পিক আবহ। টুরিস্টদের কথা চিন্তা করে আজানের সময় মসজিদের মাইকের আওয়াজও সহনীয় মাত্রায় রাখা হয়। আজান ছাড়া মাইকের কোন আওয়াজ শুনা দুরের কথা অগণিত গাড়ি চলাচল করছে একই সাথে, সাত আটটি লেন দিয়ে, কিন্তু কোন হর্ণ শুনবেননা। কেহ হর্ণ বাজাবেও না। হর্ণ বাজিয়ে কান ঝালাপালা করার কোন নিয়ম নেই সেখানে।

আমাদের দেশে মাইকের আওয়াজ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রনের জন্য কারো কোন নজর নেই। বিভিন্ন মহল শব্দদূষনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষন করছেন বিরামহীনভাবে, কান ঝালাপালা করে মানুষকে করা হচ্ছে বধির, ক্ষতি করা হচ্ছে বাচ্ছাদের লেখাপড়ার, কষ্ট দেয়া হচ্ছে রোগীদের, ব্যাঘাত ঘটানো হচ্ছে মানুষের ঘুমের, সেদিকে নজর দেয়ার প্রয়োজনও মনে করছেননা কেহ। মসজিদ থেকে বের হয়ে কফিআড্ডা হলো পার্শ্ববর্তী কফিশপে। সাথে প্রিয় ভাই সাবেল এবং ভাতিজা জাছিম। জাছিমের জন্ম দুবাইয়ে এবং দুবাইয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন পরিবারের সাথে।

পাঁচদিনের সংক্ষিপ্ত সফরে অনেকগুলো দাওয়াত পেলাম বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। সবগুলোতে শরিক হতে পারিনি সময় স্বল্পতার জন্য। আমার প্রিয় কবিবন্ধু ৭১টিভির আরব আমিরাত প্রতিনিধি সাংবাদিক গীতিকার ও ছড়াকার লুৎফুর রহমান ভাইয়ের ব্যবস্থাপনায় এবং সেখানে অবস্থানরতো লেখক কবি সাংবাদিক সাহিত্যিক গীতিকার শিল্পী ব্যবসায়ী ও প্রবাসী কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে শারজাহস্থ বাংলাদেশ সমিতির হলরুমে আমার বারোতম সঙ্গীতের অ্যালবাম ‘‘আমার বাংলাদেশ’’ এর মোড়ক উন্মোচন হয় চমৎকার পরিবেশে। সম্মাননা প্রদান করা হয় আমাকে। অনুষ্ঠিত হয় সিলেট লেখক ফোরাম এবং লন্ডন টাইমস নিউজ এর উদ্যোগে জমজমাট সাহিত্য আড্ডা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, আরব আমিরাত সফররতো মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। প্রধান আলোচকের বক্তব্য রাখেন দুবাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন খান।

৭১ টিভির সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিনিধি সাংবাদিক কবি লুৎফুর রহমানের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সমিতি শারজাহ এর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইসমাইল গনি চৌধুরী, সংগঠক ও প্রবাসী কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ মনসুর সবুর, বাংলাদেশ সমিতি শারজাহার সেক্রেটারি জেনারেল শাহ মোহাম্মদ মাকসুদ, মিনিস্ট্রি অব হাউজিং এন্ড পাবলিক ওয়ার্কস এর প্রধান একাউন্টস অফিসার সোহেল আহমেদ, জনতা ব্যাংক দুবাইয়ের ব্যবস্থাপক আবদুল মালেক, গীতিকবি শিল্পী ও সমাজসেবী সোলেমান বাউল, ইউএই প্রেসক্লাবের সভাপতি শিবলী আল সাদিক, ইউএই প্রবাসী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও একুশে টিভির প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম তালুকদার, নতুন সময় টিভির প্রতিনিধি শামসুর রহমান সুহেল, ৫২ বাংলা টিভির প্রতিনিধি তিশা সেন, এসএ টিভির প্রতিনিধি সিরাজুল হক, এনটিভির প্রতিনিধি মামুনুর রশীদ, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক সংবাদ পাঠিকা সানজিদা ইসলাম, সিএনএন বাংলা ইউএই প্রতিনিধি ওসমান চৌধুরী, সাংবাদিক মহিউল করিম আশিক, মোহাম্মদ নেওয়াজ, আমিনুল ইসলাম, শামসুল হক, মোহাম্মদ জাবেদ, আজিমুল গনি, মোহাম্মদ নুর উদ্দিন, মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, মেহাম্মদ ইদ্রিস, সংগঠক নাসির চৌধুরী, জাছিম উদ্দিন, রাজন মিয়াসহ প্রবাসী কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে আমার বক্তব্যে বিমানবন্দরে প্রবাসী এবং ভ্রমণকারীদের হয়রানীর কথা তুলে ধরলাম। আমার দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতাও তুলে ধরলাম। হলভর্তি প্রবাসীরা তুমুল করতালি ও আওয়াজ দিয়ে কথাগুলো সমর্থন করেন এবং এসবের প্রতিকার চান। আমার বক্তব্যের জবাবে প্রধান অতিথি ও প্রধান আলোচক বিষয়গুলি সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন বলে তাদের বক্তব্যে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশ সেন্টারেই সকলে রাতের বুফে খাবার শেষে লুৎফুর ভাইয়ের ৭১টিভির এবং ৫২বাংলাটিভির টিম এবং আমাদের সঙ্গী সাথীসহ দুটো গাড়িতে করে আরেকটি অনুষ্ঠানে যোগদান করি। এরপর সকলকে নিয়ে দুটো গাড়িতে করে প্রায় ঘন্টাদেড়েকের রাস্তা জুমারার দিকে সিলেট লেখক ফোরামের আয়োজনে সাহিত্য আড্ডায় যোগদানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। লুৎফুর ভাইয়ের গাড়ি তিনি নিজেই ড্রাইভ করছেন। আমাকে বসালেন নিজের পাশের সিটে। গাড়ি ড্রাইভ করছেন আর চমৎকার সিলেটী সব গান গাইছেন নিজ কন্ঠে। সাথে গাইছেন আমাদের সিলেটী আরেক প্রিয় শিল্পী ও গীতিকার সোলেমান বাউলসহ সঙ্গীরা। সোলেমান বাউল নিজের লেখা কয়েকটি সিলেটী গানও নিজ কন্ঠে শুনালেন আমাদেরকে। খুবই মজা করে গভীর রাতে ফিরলাম জুমারায় সাগরপারে আলিশান এবং দৃষ্টিনন্দন এক বাড়ীতে। সেখানে পূর্ব থেকেই সাহিত্য আড্ডা আয়োজনের সুব্যবস্থা ও বাহারি ফল ফলাদি পরিবেশনের আয়োজন করে অপেক্ষমান রসিদ ভাই ও সাবেলসহ অনেকেই। সদলবলে উপস্থিত হলাম আমরা। আয়োজন হলো জমজমাট সাহিত্য আড্ডার। সাথে মজাদার আপ্যায়ন চললো গভীর রাত পর্যন্ত।

পাঁচদিনের স্মরণীয় আড্ডার মধ্যে ছিল বিশ্ববিখ্যাত এবং বিশ্বের এ যাবতকালের সর্বোচ্চ এবং অত্যাধুনিক টাওয়ার বুর্জ খলিফা স্বচক্ষে কাছে গিয়ে দর্শন। রাতের আলোকসজ্জা ও পুরো টাওয়ারব্যাপী সাজানো দৃষ্টিনন্দন ক্যারিশম্যাটিক আলোকরশ্মির ঝলকানি অভিভুত করে যে কাউকেই। মিউজিকের তালে তালে প্রদর্শন করা হয় একেক সময় একেক ধরনের নান্দনিক আলোকসজ্জা।

‘বুর্জ খলিফা’ ভবনটির উচ্চতা ২ হাজার ৭১৭ ফুট বা ৮২৯.৮ মিটার। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কাইস্ক্রাপার বা গগনচুম্বী দালান। স্কাইস্ক্রাপারটি বাড়ি, হোটেল এবং অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হলো দালানটির ১২৪ তলার উপরের অবজারভেশন ডেক। বুর্জ খলিফাতে আছে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত এলিভেটর/লিফট যা দ্রুত ১২৪ তলায় উঠে আপনাকে পৌছে দেবে অবজার্ভেশন ডেকে। ডেক থেকে ৩৬০ ডিগ্রী ভিউতে দেখা যাবে পুরো দুবাই। একপাশে ধু ধু মরুভূমি, আরেকপাশে ফেনীল সমুদ্র। রাতের দৃশ্য আরো নান্দনিক। রাতে রঙিন আলোয় ঝলমলে দুবাই শহর আর তার রাস্তাগুলো সৌন্দর্য্যরে এক নতুন দরজা খুলে দেয়। এতে আছে ২০৬টি তলা। এর মধ্যে প্রায় ১০০ তলায় যাওয়ার টিকিটের মূল্য ১৬০ দিরহাম থেকে আড়াইশো দিরহাম পর্যন্ত (৩ হাজার ৬৮০ টাকা থেকে ৫ হাজার ৭৫০ টাকা)। ১৬০ তলা পর্যন্ত যেতে চাইলে অনুমতি নিয়ে আরও বেশি দিরহাম খরচ করতে হয়। বুর্জ খলিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে অনলাইনে টিকিট কেনার বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। ভবনটির চারদিকের সৌন্দর্যও মুগ্ধতার আবেশ ছড়ায় মনে। বুর্জ খলিফার আশেপাশের মনোরম পরিবেশ বিমোহিত করে পর্যটকদের।

সামনের লেকে বিভিন্ন ধরনের ঝর্নাধারা ও পানি দিয়ে প্রদর্শিত দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারাও অভিভুত করে দর্শকদের। চমৎকার এসব প্রদর্শণী দেখার জন্য সন্ধ্যার পর থেকে এশিয়া ইউরোপ আমেরিকা আফ্রিকাসহ বিশ্বের অগণিত পর্যটকের ভিড় মুগ্ধ করে সকলকে।

উল্লেখ্য এখানে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়া খুবই কঠিন। পাশেই বহুতলবিশিষ্ট বিশাল গাড়ি পার্কিংজোনের প্রতিটি তলায় প্রায় একঘন্টা ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে আটতলায় আমরা পেয়েছিলাম গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। পার্কিংয়ের জন্য জায়গা না পাওয়া পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে শুধু ঘুরতেই হয়। কোথাও দাড়ানোর সুযোগ নেই।

পাশেই রয়েছে বিখ্যাত দুবাই মলসহ সুউচ্চ সব ইমারত ও দৃষ্টিনন্দন মার্কেট। এর ভেতরে একটি জায়গায় বিশাল আকারের অ্যাকুরিয়ামে সাজিয়ে রাখা হয়েছে অগণিত সামুদ্রিক মাছ। ছোট বড় মাঝারি বাহারি জাতের সামুদ্রিক মাছ সাতার কাটছে মনের আনন্দে অ্যাকুরিয়ামের ভেতরে। আর পর্যটকরা তা উপভোগ করে আনন্দ পাচ্ছেন এবং লাইন ধরে ছবি তুলে মুহুর্তটিকে ধারন করে রাখছেন স্মরণীয় করে। আল্লাহর স্মৃষ্টিজগতের মধ্যে কতো ধরনের মাছ যে আছে তা এখানে গিয়ে না দেখলে অনুমান করা কঠিন। অনেকগুলি মাছ দেখলাম মানুষের চেয়েও কয়েকগুণ বড়। আকৃতি ও চেহারা ছুরতেও ভিন্নতা। কোনটার মুখ নিচদিকে আবার কুনটার মুখ উপর দিকে। কোনটার দেখা যাচ্ছে বড় বড় দাত। কোনটা দেখতে অবিকল পাখির মতো ডানা দিয়ে উড়ছে পানিতেই। আরেক জায়গায় দেখলাম মানুষের আকারে তৈরি করা পুতুল মিউজিকের তালে তালে টাওয়ারের উপর থেকে নিচ দিকে অনবরত নামছে আর পর্যটকরা তা প্রাণভরে উপভোগ করছেন।

দুবাই মলে কেনাকাটার জন্য আকর্ষনীয় দ্রব্যাদির অভাব নেই। মার্কেটটি তৈরি করা হয়েছে পর্যটকদের জন্যই নান্দনিক ডিজাইনে। আর সেথায় আড্ডা দিচ্ছেন ও মার্কেটিং করছেন সারা বিশ্বের পুরুষ নারী শিশু কিশোর তথা বিচিত্র ধরনের পর্যটকেরা। ভেতরে ঢুকলে মধ্যপ্রাচ্যে নয় বরং মনে হয় ইউরোপের কোথাও বিচরণ করছেন আপনি। সেখানে আমরা কাটালাম রাতের অনেকটা সময়।

অবশেষে গভীর রাতে জুমারা সাগরপারে সাবেলের বাসায় ফেরা ও সাবেল এবং রাজনের নিজ হাতে পুষা কবুতরের গোশত দিয়ে রাতের মজাদার আপ্যায়ন করলাম আমরা। উল্লেখ্য, প্রিয় ভাই রাজন দিনেই চারটি কবুতর জবাই করে আমাকে খাওয়ানোর জন্য। সবার প্রিয় লালভাই পাক করেন খুবই মজা করে। লালভাইসহ সকলে মিলে বুড়িভোজন সম্পন্ন করি একসাথে সকলে। সাথে ছিল আরবীর ঘরের পাক করা মুরগির কারি এবং অন্যান্য কয়েক ধরনের আইটেমও।

পাঁচদিনের ভ্রমনের অন্যতম আকর্ষন ছিল ঐতিহাসিক এবং দৃষ্টিনন্দন শারজাহ মসজিদ পরিদর্শন। সেখানে পবিত্র জুমআর নামাজ আদায় করলাম আমরা। প্রিয় ভাতিজা জাছিমের ড্রাইভে প্রিয় আজিজুল ভাইয়ের গাড়িতে করে সাবেলসহ আমরা তিনজন শারজাহ মসজিদে জুমআর নামাজ আদায় ও নান্দনিক কারুকার্যখচিত এই মসজিদের ও আশপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করে মোহিত হয়েছিলাম আমরা সকলে। ফেরার পথে সোনাপুরে বাঙ্গালী রেস্টুরেন্টে প্রিয় ভাতিজা জাছিমের সৌজন্যে দুপুরের খাবারও ছিল মজাদার রেসিপিতে ভরপুর। পরদিন পরিদর্শন করেছিলাম ঐতিহাসিক কোরআনিক পার্ক। পার্কটির সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ এখনও চলমান। বিশাল আয়তনের এ পার্কের ভেতরে বাহারি সব ফুলের বাগান কেড়ে নেয় মন ও প্রাণ। চমৎকার ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম পাহাড়। কার্ডের মাধ্যমে বিল পে করে ওই পাহাড়ের ভেতরে ঢুকলে আপনি চলে যাবেন অন্য জগতে। মনে হবে আপনি আছেন মাটির নিচে বিশাল গুহার বা সুড়ঙ্গের ভেতরে। আরেক জগতে। সেখানে টুরিস্টদের জন্য ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটিপর্বে প্রদর্শিত হয় আরব ইতিহাসের অনেককিছুই। ব্যতিক্রম এক ধরনের প্রজেক্টরে বিশেষ ব্যবস্থায়। পর্যটকদের একের পর এক ধারাবাহিকভাবে নিয়ে চলেন সেখানে দায়িত্ব পালনরতো গাইড। ধারা বর্ণনা চলে সেখানে স্থাপন করা বিশেষ এক ধরনের প্রজেক্টরে বিশেষ ভঙ্গিমায়। যা দেখার জন্য ভীড় লেগেই থাকে পর্যটকদের।

পরদিন রাতে পরিদর্শন করলাম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম স্বর্ণের মার্কেট। আমাদেরকে রিসিভ করলেন সেখানকার ব্যবসায়ী বিজিত দাস। আপ্যায়ন করালেন নিজের বিশাল স্বর্নের দোকানেই। দুবাইয়ের ডেরায় অবস্থিত বিশাল এ মার্কেটে জামার আদলে সারা শরির আবৃত করার কয়েককেজি ওজনের নান্দনিক ডিজাইনের অলংকারও প্রদর্শিত হচ্ছে বিক্রয়ের জন্য। কয়েক কেজি ওজনের বিশাল বড় আংটিও দেখলাম রাখা হয়েছে সাজিয়ে। মার্কেটের যেদিকে তাকানো যায় শুধু সোনা আর সোনা করছে ঝলমল। জানতে পারলাম সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই উঁচুমানের।

মার্কেটের অদুরে বাঙ্গালী ও পাকিস্থানী অধ্যুষিত ডেরা এলাকা পরিদর্শন ও বাঙ্গালী রেস্টুরেন্টে সম্পুর্ণ বাঙ্গালী পরিবেশে চানা পিয়াজু চা ইত্যাদি আপ্যায়ন শেষে ফেরার পথে আলো আধারীর খেলা দেখতে দেখতে লেক পারাপারে চমৎকার বুট চড়া হলো আমাদের তিনজনের।

পরদিন চমৎকার টুরিস্ট বাসে চড়ে গেলাম দুবাইয়ের সাগরপাড়ে অবস্থিত বিশাল এবং আকর্ষনীয় মার্কেট ইবনে বতুতা মল পরিদর্শনে। চমৎকার এ মার্কেটটিতে আকর্ষনীয় সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সারা দুনিয়ার গ্রাহকদের পদচারনা মোহিত করল আমাদেরকে। মার্কেটের ডিজাইন করা হয়েছে অনেকটা মোগল আমলের স্থাপনার আদলে। এটা মুলত পর্যটকদের আকর্ষনের জন্যই। অবাক করা সব ডিজাইন ও তৈজসপত্র দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেননা যে কেউ। মার্কেটের ভেতরেই বিশাল গম্বুজআকৃতির স্থাপনা। এরমধ্যে নকশী ডিজাইন মন কাড়ে যে কারও। এছাড়া কোন কোন স্থানে সুউচ্চ ছাদগুলি এক্কেবারে আকাশের আদলে সাজানো হয়েছে। উপর দিকে তাকালে মনে হয় আকাশ দেখা যাচ্ছে। এইতো আকাশ। কিন্তু অবিকল আকাশের মতো দেখা গেলেও তা মানুষের তৈরি কৃত্রিম আকাশ।

যাওয়ার সময় বাসে গেলাম আমরা দুজন। লালভাই ও আমি। বাসগুলো খুবই উন্নত ধরনের এবং নির্ত নতুন। বাংলাদেশ বিমানের সিটের চেয়ে বহুগুণে উন্নত সিট। পরিচ্ছন্নতারতো তুলনাই হয়না। সবকিছু ঝকঝকে থকথকে। জায়গায় জায়গায় আছে বাস স্টপেজ। স্টপেজগুলোতে এসি লাগানো। বসার এবং বিশ্রামের জন্য চমৎকারভাবে সাজানো চেয়ার। কম্পিউটার স্ক্রিনে লাইভ দেখা যাচ্ছে কয়মিনিট পর কোন বাস আসছে। বাসে উঠার সাথে সাথে গেটের নির্ধারিত বক্সে সঙ্গে থাকা কার্ডটি টাচ করতে হয় এবং নামার সময়ও কার্ড টাচ করলে ওই কার্ড থেকে নির্ধারিত ভাড়া কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে পে হয়ে যায়। নগদ ভাড়া দেবার কোন ঝামেলা নেই এসব বাসে।

ফেরার পথে চড়া হলো মেট্ররেল। সেখানকার মেট্ররেলগুলোও খুবই উন্নতমানের এবং আকর্ষনীয়। চলাচল করে বিদ্যুৎ গতিতে। খুবই আরামদায়ক এবং উপভোগ করার মতো মেট্ররেলভ্রমণ। আমাদের দেশের বিমানের চেয়েও এর ভেতরকার সৌন্দর্য ও সুযোগ সুবিধা বেশিই মনে হলো। বাসের মতো একই পদ্ধতিতে কার্ড দিয়ে ভাড়া পরিশোধ করতে হয় এবং ভাড়াও সহনীয় মাত্রার। আমরা ট্রেনে উঠতেই শুরু হলো প্রচন্ড বেগে বৃষ্টি, সাথে আকাশের প্রচন্ড গর্জন। বাসার অদুরের ষ্টেশনে নেমে আটকা পড়লাম বৃষ্টির কারণে। আমার প্রিয় লালভাই বললেন আপনার ভাগ্য ভালো। দুবাইয়ে সারা বৎসরে সাধারনত দু-একবার বৃষ্টি হয়। আপনি সংক্ষিপ্ত সফরে এসে রিমঝিম বৃষ্টির দেখাও পেয়ে গেলেন। উপভোগ করলেন মরুভুমির বৃষ্টি।

বৃষ্টি হলে আরবরা হন খুবই খুশি। তারা বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ ফুর্তি করেন সকলে মিলে। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যেই একটি ট্যাক্সি ডেকে টেক্সিতে করে পৌছলাম বাসায়। রাতে রসিদ ভাইয়ের বাসায় দাওত খেলাম দলবেধে আমরা বেশ কয়েকজনে চরম আনন্দে।

পরের রাতে গেলাম মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ সবজি মার্কেটে ওই মার্কেটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হারুন ভাইয়ের আমন্ত্রনে মিলাদুন্নবী মাহফিল ও আলোচনা সভায় অতিথি হয়ে। মাহফিল শেষে আট গরুর জিয়াফত খাওয়া হলো বাঙ্গালীয়ানা পরিবেশে। কয়েক হাজার প্রবাসী জিয়াফত খেলেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাকিস্থানী ও ভারতীয়রাও ছিলেন। জিয়াফতের তরকারীর মধ্যে অন্যতম ছিলো গরুর পায়ার কারি, গরুর গোশত এবং লাউ দিয়ে তরকারি, ভুনা এবং ডাল। এমন মজাদার স্বাধ ছিল তরকারিতে যা মনে থাকবে বহুদিন।

দেশে ফেরার দিন গেলাম বিশ্বের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন মসজিদ আবুধাবির শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ পরিদর্শনে। সুহৃদরা জানালেন এই মসজিদ পরিদর্শন না করে গেলে আপনার আমিরাত ভ্রমণ অসম্পুর্ণই রয়ে যাবে। সিলেটের প্রবীণ সাংবাদিক কলামিষ্ট আফতাব চৌধুরী জানালেন ‘‘সময় পেলে এ মসজিদটি দেখে আসবেন, শান্তি পাবেন’’।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থানের তালিকায় রয়েছে শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ। মসজিদটি বিশ্বের অন্যতম অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের একটি আধুনিক নিদর্শন। এর অবস্থান আবুধাবি শহরে। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় এবং দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। মসজিদটি ৩০ একর জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখানে একসাথে ৪০০০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের অভ্যন্তরে সোনা, মোজাইক টাইলস, কাচ এবং মার্বেলের প্রচুর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। আর বাইরের দিক তৈরি স্বেতপাথরের। কিবলার দেয়ালে চোখে পড়বে মহান আল্লাহপাকের নিরানব্বইটি নাম। দেয়ালের কারুকার্যও আকর্ষন করে দর্শনার্থীদের।

আজিজুল ভাইয়ের গাড়িতে করে ভাতিজা জাছিমসহ আমরা তিনজন দুবাই থেকে রওয়ানা দিয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টা জার্নি শেষে পৌছলাম সেখানে। চলার পথে দৃষ্টিনন্দন এবং সুউচ্চ ইমারত, চমৎকার সব রোড আর মন মাতানো সব দৃশ্য দেখা হলো আমাদের। রাস্তায় নেই কোন বিশৃঙ্খলা। নেই ফুটপাত দখলের মহোৎসব। নেই গাড়ীর হর্ণ বাজানোর বিকট শব্দ। সুযোগ নেই যেখানে সেখানে গাড়ি দাড় করানোর। যাত্রি উঠানোর ও নামানোরও। রাস্তায় নেই কোন নোংরা আনফিট বা লক্করঝক্করমার্কা গাড়ী। কোন নোংরা বা পুরনো গাড়ী রাস্তায় বের করলেই নির্দিষ্ট হারে জরিমানা গুণতে হয় সেদেশে। রোডে উল্লেখ করা নির্ধারিত গতিবেগের চেয়ে বেশি গতিতেও গাড়ি চালালে গুণতে হয় জরিমানা। পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান ছাড়া কোথাও গাড়ি দাড় করালেও গুণতে হয় জরিমানা। যে কোন ধরনের আইন ভঙ্গ করলেই জরিমানা দিতে হবে। তাই কেহ আইন ভঙ্গ করেননা ইচ্ছা করে। খুবই সতর্ক থাকেন যাতে জরিমানা দিতে না হয় সেজন্য।

শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ পরিদর্শণে বিশ্বের অগণিত পর্যটক প্রতিদিনই ভিড় করেন সেখানে। অমুসলিম এবং মহিলাদের জন্যও মসজিদটি পরিদর্শনের আলাদা সুযোগ আছে। তবে বেপর্দা মহিলারা নির্ধারিত স্থান থেকে বুরকা সংগ্রহ করে তা পরিধান করে প্রবেশ করতে হয় মসজিদের নির্ধারিত জায়গায়। পরিদর্শন শেষে ফেরার সময় বুরকা ফেরত দিয়ে যেতে হয়। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই কঠোর। বিশাল এ মসজিদটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অপলকনেত্রে চেয়ে থাকতেই মন চায় শুধু। অনেক দুর থেকে তাকালেও এর আলাদা সৌন্দর্য মন ভরিয়ে দেয়। রাতের দৃশ্য আরও চমৎকার বলে জানালেন তারা। এমন চমৎকার পরিবেশ এবং বিলাসবহুল অজুখানা হাম্মামখানা সৌদিআরবেও দৃষ্টিগোচর হয়নি আমার। মসজিদের চমৎকার কারুকাজ দেখলে ফিরতে মন চায়না সেখান থেকে। বাইরে সবুজ ঘাস ও বাগান এবং গাড়ি পাকিংয়ের স্থান সবই নির্মাণ এবং সাজানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। আমরা প্রাণভরে উপভোগ করলাম মসজিদটির অপরূপ সৌন্দর্য এবং নান্দনিক কারুকাজ। আদায় করলাম মসজিদে জোহরের নামাজ।

মসজিদ থেকে ফেরার পথে একটি সুপার মার্কেট থেকে কিছু খাবার কিনে গাড়িতে গল্প করতে করতে খাওয়া ও পরবর্তীতে সোনাপুরে রেস্টুরেন্টে খাবার দাবার পর দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। এরপর কিছু মার্কেটিংও করলাম। আসার সময় সবার প্রিয় লালভাই, সাবেল ও রাজন অনেক ধরনের খেজুরসহ অনেক কিছু উপহার দিয়েছিলেন দেশে নিয়ে আসার জন্য। সেগুলোও আনলাম।

তবে দুবাইয়ে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা আমার কাছে মনে হলো তা হলো আবাসন সমস্যা। বাড়ী ভাড়া আকাশচুম্বী হওয়ায় প্রবাসীরা প্রতিটি কক্ষে গাদাগাদি করে আজাবের সাথে বসবাস করেন। প্রতিটি কক্ষেই দোতলা তিনতলা অর্থাৎ কয়েকথাকের খাট। তিনতলায় তিনজন করে ছোট্ট ছোট্ট কামরায় দশ বারো পনের ষোলজন করে বসবাস করেন খুবই কষ্ট ও ঠাসাঠাসি করে। নিজ বেডে সোজা হয়ে বসা সম্ভব হয়না। আবার ফোনে কথা বলতে গেলেও হিসেব করে বলতে হয়। কারন উপরের নিচের বা পাশের সিটের কারো যদি ঘুমের ব্যাঘাত হয়। একেকজনের একেক সময় ডিউটি তাই কেহ এসে ঘুমান আবার কেহ উঠে চুপে চুপে চলে যান কর্মস্থলে। এই কক্ষেই ফ্লোরে সামান্য খালি জায়গায় বসে পিয়াজসহ তরিতরকারী কাটতে হয়। নিজ হাতে রান্না করতে হয়। কাপড় চোপড় ধুইতে হয়। একমাত্র যারা কফিলের বাসায় থাকেন অথবা নিজে একা বা দু-তিনজন এক কক্ষে থাকেন তারা একটু আরামে আছেন। নতুবা ঘুমানুটাই সেখানে বড় আজাবের। যদিও খাবার দাবারে তেমন একটা সমস্যা হয়না তাদের।

প্রবাসী স্বজনদের সিমাহীন আতীথেয়তা ও মায়ার বন্ধনে পাঁচদিনের সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ১২ নভেম্বর নিজ দেশে ফেরার জন্য দুবাই এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ১ এ পৌছলাম আজিজুল ভাইয়ের সৌজন্যে। ইমিগ্রেশন শেষে আবারও বাংলাদেশ বিমানে করেই দেশে ফেরার পালা। বিমানে বসে বসে ভাবলাম আমাদের দেশের চাইতে মাত্র এক বছর পূর্বে স্বাধীন হওয়া দেশটির অভাবনীয় উন্নতির কথা, যা স্বচক্ষে দেখে আসলাম নিজেই। যে দেশে শুধু বালি আর বালি। ধু ধু বালুচরে কোন ফসল ফলানোর পরিবেশ নেই। আবহাওয়াও বৈরী। বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকে প্রচন্ড গরম। বৃষ্টিরও দেখা মেলেনা দু-একদিন ছাড়া প্রায় সারা বছর। এসি ছাড়া ঘুমানো প্রায় অসম্ভব। আয়তনের দিক থেকেও আমাদের দেশের চেয়ে অনেক ছোট্ট দেশটি। কোন যাদুমন্ত্রের বদৌলতে দেশটির এতো উন্নতি। কোন আলাদিনের চেরাগতো পায়নি তারা। তাদের সাফল্যের চাক্ষুষ প্রমাণ দেখেও শিক্ষা নিতে পারিনি আমরা। সাজাতে পারিনি আমাদের সোনার দেশটিকে সেমতো করে। আমরা শিখতে পারিনি তাদেরমতো মধুর ব্যবহার। তাদের মতো সততাতো খুজে পাওয়া যায়না আমাদের মধ্যে। আমরা হিংসার আগুণে জ্বলেপুড়ে ছারখার হই প্রতিনিয়ত। কাকে কখন কিভাবে ঘায়েল করা যায় সে চিন্তাই আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায় হরদম। মানুষের কল্যাণ করার একটু ফুরসততো নেই আমাদের মধ্যে।

আমাদের দেশের হাজার হাজার শ্রমিক সেখানে গিয়ে কাজ করে পরিবার পরিজন চালাচ্ছেন। নিজ দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকলে ওরা অন্য দেশে গিয়ে কাজ করতে হতোনা। নিজ দেশেই বসবাস করতে পারতেন স্বাচ্ছন্দে পরিবার পরিজনদের সাথে।

আজিজুল ভাই, ভাতিজা জাছিম, সাবেল, রাজন, লালভাই, সোলেমান বাউল ভাই, রসিদ ভাই, হামদুমিয়াসহ স্বজনদের আতিথেয়তা মনে পড়ল বারে বারে। ছড়াকার কবি লুৎফুর রহমান ভাই ও ৭১ এবং ৫২ বাংলাটিভি পরিবারের এবং আমিরাতে অবস্থানরতো সকল সাংবাদিক লেখক কবি সাহিত্যিক শিল্পী সুহৃদসহ বন্ধু স্বজনদের আন্তরিকতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া প্রতিদান দেয়ার সাধ্য নেই আমার।

ঢাকায় অবতরণ করলাম প্রায় ছয় ঘন্টা টানা আকাশে উড়ার পর। আর ঢাকা বিমানবন্দরে বসিয়ে সিলেটী ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষমান রাখা হলো আরও প্রায় ছয় ঘন্টারও বেশি সময়। দীর্ঘ সময় এয়ারপোর্টে বসে টে টে করা ছাড়া উপায় নেই কারো। বিরক্তিকর অপেক্ষার প্রহর শেষে সিলেটগামী একটি বিমানে উঠানো হলো আমাদের। প্রায় চল্লিশ মিনিট আকাশে উড়ার পর এসে পৌছলাম সিলেটে। স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসার যে আনন্দ তা একমাত্র অনুভব করা যায়। ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতার সময় কর্তব্যরতো কর্মকর্তাকে বললাম, ভাইজান হিদিনযেনে গেছলাম ওউ আইচ্ছি।

 

লেখক: নাজমুল ইসলাম মকবুল

সভাপতি, সিলেট লেখক ফোরাম

০১৭১৮৫০৮১২২