প্রচ্ছদ

করোনা ঠেকাতে দেশে প্লাজমার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হচ্ছে

  |  ১৪:০৭, মে ১৪, ২০২০
www.adarshabarta.com

অাদশর্বার্তা ডেস্ক::

আপনি কোভিড–১৯ থেকে সুস্থ হয়ে থাকলে প্লাজমা দানে এগিয়ে আসুন। আজই এসএমএস করুন…’

এমন একটি খুদে বার্তা (এসএমএস) যাচ্ছে করোনাভাইরাসজনিত কোভিড–১৯ আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের কাছে। কোভিড–১৯ রোগীদের সারাতে প্লাজমাথেরাপির সম্ভাবনা যাচাই করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠন করা কারিগরি উপকমিটির পক্ষ থেকে এর প্রধান অধ্যাপক এম এ খান এই এসএমএস দিয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক খান বলেন, ‘আগামী শনিবার (১৬ মে) থেকে প্লাজমা সংগ্রহ শুরু হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোভিড–১৯ সেরে ওঠা ব্যক্তিদের তালিকা দিয়েছে। সেই তালিকা ধরেই আমরা এখন প্লাজমা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য এই সংগ্রহ। প্রথম দফায় ৯০ জনের ওপর এ ট্রায়াল চলবে। প্রথমে ঢাকা শহরের আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছে থেকেই প্লাজমা সংগ্রহ করা হবে।’

গত ২৮ এপ্রিল বিশ্ব সাহায্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চলমান পরীক্ষামূলক কোভিড-১৯ চিকিৎসার তালিকা দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ৩৩টি সুনির্দিষ্ট ধরনের এবং ‘অন্যান্য’ ওষুধ ব্যবহার করে চিকিৎসার কথা আছে। এগুলোতে সব মিলিয়ে একক ওষুধ বা ওষুধের সমন্বয়ে দুই শর কাছাকাছি ধারার চিকিৎসা চলছে। তালিকায় প্লাজমা, স্টেম সেলসহ অনেকগুলো পরীক্ষামূলক থেরাপির কথাও আছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই থেরাপির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে গত ১৮ এপ্রিল একটি কারিগরি উপকমিটি গঠন করে। কমিটি পরীক্ষামূলক গবেষণার জন্য একটি প্রটোকল তৈরি করে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের কাছে (বিএমআরসি) জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের প্রস্তাবের নৈতিক দিক খতিয়ে দেখে অনুমোদন দেয়। তবে পরীক্ষামূলক গবেষণার জন্য কমিটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নৈতিক অনুমতি পেয়েছে। সে জন্যই এখন শুরু হবে প্লাজমা সংগ্রহ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন প্লাজমার পরীক্ষামূলক ব্যবহার হবে। এর কার্যকারিতা দেখার পর এটি প্রয়োগ করা হবে। এর জন্য দু–তিন মাস সময় লাগতে পারে।’
রক্তের জলীয় অংশকে বলে প্লাজমা। তিন প্রকারের কণিকা বাদ দিলে রক্তের বাকি অংশ রক্তরস। কোনো মেরুদণ্ডী প্রাণীর শরীরের রক্তের প্রায় ৫৫ শতাংশই হলো রক্তরস।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরাসবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠা ব্যক্তির শরীরের এক প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়, যাকে বলে অ্যান্টিবডি। এই অ্যান্টিবডি হয়ে যায় নতুন রোগীর প্রতিষেধক। সেরে ওঠা রোগীর অ্যান্টিবডি নতুন আক্রান্ত রোগীকে সহায়তা করে রোগের সঙ্গে লড়াই করতে। প্লাজমাথেরাপিতে সদ্য সেরে ওঠা রোগীর রক্তের তরল, হালকা হলুদাভ অংশটি নিয়ে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির শরীরে ঢোকানো হয়।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, একজন সেরে ওঠা ব্যক্তি রসরস দিলে তার কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
প্লাজমা-সংক্রান্ত কারিগরি কমিটি সূত্র জানিয়েছে, শনিবার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ট্রান্সফিউশন কেন্দ্রে রক্তরস সংগ্রহ করা হবে। ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুযায়ী প্লাজমা দাতার কয়েকটি পরীক্ষা করে পরে প্লাজমা নেওয়া হবে। দাতার হেপাটাইটিস বি, সি, এইচআইভি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা করা হবে।

নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ হয়তো করোনা থেকে সেরে উঠেছেন, কিন্তু এগুলো থাকলে যার শরীরে প্লাজমা যাবে, তার জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এসব রোগীর রক্ত সংগ্রহ করে প্রথমে দেখা হবে তাদের অ্যান্টিবডি আদৌ তৈরি হয়েছে কি না। এটি পরীক্ষা করতে প্রয়োজনীয় কিটটি স্পেন থেকে আনা হচ্ছে। এটি আগামী শনিবারের মধ্যে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন কমিটির সদস্যরা। একজন চিকিৎসক এটা জাতীয় কমিটিকে এনে দিচ্ছেন। বিনা খরচায় তিনি এটা দিচ্ছেন। এতে ছয় লাখ টাকা খরচ পড়ছে।
প্লাজমা সংগ্রহের জন্য আলাদা কিট দরকার হয়। এর একেকটির দাম হয় ১২ হাজার টাকা। একজন সেরে ওঠা ব্যক্তির ক্ষেত্রে একটি কিটই ব্যবহার করা যায়। তবে একজনের প্লাজমা অন্তত দুজনকে দেওয়া যায়।
অধ্যাপক এ এ খান বলেন, একজনের শরীর থেকে ৬০০ মিলিলিটার প্লাজমা নেওয়া যাবে। ৬০০ মিলিলিটার থেকে ২০০ মিলিলিটার করে তিনজনকে দেওয়া সম্ভব। অনেক সময় এমন হয় যে, একজনকে দুবার দেওয়া লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে কম রোগীকে দেওয়া যাবে।
কোন ধরনের রোগীকে প্লাজমা দেওয়া হবে?
কোভিড–১৯-এ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত রোগীকেই প্লাজমাথেরাপি দেওয়া হবে। এম এ খান বলেন, ‘যে রোগী হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছেন এবং মুমূর্ষু—তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো রোগী যাতে ভেন্টিলেশনে না যায়, সেই চেষ্টা করা। ভেন্টিলেশনে চলে যাওয়া রোগীর ওপর প্রয়োগ করলে ফল খুব ভালো আসবে না। পারতপক্ষে তাদের দেওয়া হবে না।’
পরীক্ষামূলক গবেষণা হবে মোট ৯০ জন রোগীর ওপর। এদের মধ্যে ৪৫ জনকে প্লাজমা দেওয়া হবে বাকিদের দেওয়া হবে না। উভয়ের পার্থক্য দেখার জন্যই এটা করা হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেহেতু কোভিড হাসপাতাল হয়েছে, তাই এখান থেকেই মূলত রোগীদের নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালও তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তাই তাদের রোগীও নেওয়া হতে পারে। যাদের দেওয়া হবে, তাদের ওপর নজরদারি রাখা হবে। এ কাজটি ঢাকা মেডিকেলে অপেক্ষাকৃত বেশি সহজ হবে বলে এখানকার রোগীদেরও নেওয়া হবে।
প্লাজমা কমিটির সূত্র জানায়, এ চিকিৎসায় আনুমানিক খরচ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। তবে একজনের কাছে নেওয়া রক্তরস দুজনকে দিলে পাঁচ হাজার টাকায় সম্ভব। তবে পরীক্ষামূলকভাবে প্লাজমাথেরাপি বিনা মূল্যোই দেওয়া হবে।